মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতায় দেশে ভোগ্য পণ্যের বাজারে নতুন চাপের আশঙ্কা

Printed Edition

শাহ আলম নুর

নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। বিশেষ করে ইরানের সাথে, ইসরাইল এবং আমেরিকার যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আপাতত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি সারা বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম নৌপথ। এই প্রণালি থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া ও শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দেশের বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাংলাদেশের মোট ভোগ্যপণ্যের একটি বড় অংশই আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কেবল ভোজ্যতেল আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ডলার। দেশে বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকলেও এর ৯০ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন করে চাপে পড়বে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটলে ল্যাটির আমেরিকা ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এতে বাংলাদেশে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। তিনি বলেন, দেশের আমদানির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পণ্য মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আসে বা ওই অঞ্চলের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুদ্ধের প্রভাব পরোক্ষভাবে হলেও বাজারে পড়বে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়তির দিকে। গত এক মাসে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলার থেকে বেড়ে ৮৫ ডলারের ঘরে উঠেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যা আমদানি খরচ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শিপিং লাইনগুলো অতিরিক্ত বীমা প্রিমিয়াম ও নিরাপত্তা চার্জ আরোপ করছে বলে আমদানিকারকরা জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে যেখানে একটি কনটেইনার আনতে গড়ে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ ডলার খরচ হতো, বর্তমানে তা ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ ডলারে পৌঁছেছে।

এদিকে ইরানের ওপর ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি গবেষণা সংস্থা রাইস্ট্যাড এনার্জি এক পর্যালোচনায় জানানো হয়েছে আজ (সোমবার) বাজার খোলার সাথে সাথেই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি অন্তত ২০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। রাইস্ট্যাড এনার্জির মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া।

প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই রুট দিয়ে বিশ্ববাজারে ঢুকত যা বর্তমানে থমকে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের বিকল্প অবকাঠামো ব্যবহার করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাজারে প্রতিদিন ৮০ লাখ থেকে এক কোটি ব্যারেল তেলের নিট ঘাটতি থেকে যাবে। তেলের দাম ২০ ডলার বৃদ্ধি পেলে পরিবহন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বিশ্বজুড়ে হু হু করে বেড়ে যেতে পারে, যা নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করছে।

দেশে ভোজ্যতেলের বাজার ইতোমধ্যে স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগে খোলা সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দাম ছিল ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা, যা বর্তমানে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বাড়লে দেশে তা দ্রুত প্রতিফলিত হয়। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম তেল আমদানিতে কোনো বিঘœ ঘটলে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা নয়া দিগন্তকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে এই মুহূতে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই। তবে যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হয় তবে বাজারে প্রভাব পড়বে। এ দিকে এই যুদ্ধ যদি অল্প সময়ের মধ্যে থেমে যায় তবে ভোগ্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়বে না বলে তিনি জানান।

চিনির বাজারেও একই চিত্র। দেশে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন কাঁচা চিনির দাম সম্প্রতি ৫০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা ছয় মাস আগেও ছিল ৪৩০ থেকে ৪৫০ ডলারের মধ্যে। এর প্রভাবে দেশে খোলা চিনির কেজিপ্রতি দাম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় স্থিত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১১০ থেকে ১১৫ টাকা। মৌলভীবাজার চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল হাশেম নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা চিনির দাম টনপ্রতি ৪৫০ ডলার থেকে বেড়ে ৫০০ ডলারের কাছাকাছি গেছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘ হয়, তাহলে দাম আরো বাড়তে পারে। তিনি জানান, বর্তমানে পাইকারি বাজারে খোলা চিনি কেজিপ্রতি ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক মাস আগেও ১১০ টাকার মধ্যে ছিল।

মসুর ডাল, ছোলা ও মুগ ডালের বড় অংশ আসে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ভারত থেকে। তবে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে অস্থিরতা তৈরি হলে এসব পণ্যের আমদানিও ব্যাহত হতে পারে। বর্তমানে খোলা মসুর ডালের কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। ছোলার কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শ্যামবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, মসুর ও ছোলা ডালের বড় অংশ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ভারত থেকে আসে। তবে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে ঝুঁকি বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে। গত দুই মাসে প্রতি টন ডাল আমদানিতে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে।” বর্তমানে খোলা মসুর ডালের কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং ছোলা ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, সরকারকে এখনই কৌশলগত খাদ্য মজুদ বাড়াতে হবে। একই সাথে দ্রুত এলসি নিষ্পত্তি ও বন্দর ব্যবস্থাপনা সহজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করলে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভোক্তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে শঙ্কা কাজ করছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে খুচরা ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই দাম সমন্বয় করেন। এতে বাজারে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি হয়। বিশেষ করে রমজান বা বড় উৎসবের আগে এমন অস্থিরতা বেশি দেখা যায়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় দেশের বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো, বিকল্প সরবরাহ উৎস খোঁজা এবং কৌশলগত খাদ্য মজুদ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয়া অস্বাভাবিক হবে না।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কেবল খাদ্যপণ্য নয়, সার, গ্যাস ও শিল্প কাঁচামালের দামও বাড়তে পারে। এতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে। তাদের মতে, বাজারে অযৌক্তিক মজুদদারি ও কারসাজি রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার এই সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এজন্য তারা আগাম প্রস্তুতি ও নীতিগত সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে বৈশ্বিক সঙ্কটের অভিঘাত দেশের বাজারে কম পড়ে।