ন্যানো বায়োচার সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া উদ্ভাবনের দাবি বাকৃবি গবেষকদের
ইউরিয়া সারের অপচয় কমাতে নতুন দিগন্ত
Printed Edition
মো: লিখন ইসলাম বাকৃবি
দেশের কৃষিতে দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো ইউরিয়া সারের ব্যাপক অপচয়। মাঠে প্রয়োগ করা ইউরিয়ার বড় একটি অংশ গাছ গ্রহণ করতে না পারায় বাতাসে উড়ে যায়, মাটির নিচে লিচিং হয়ে পানিদূষণ ঘটায় কিংবা গ্রিন হাউজ গ্যাস হিসেবে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। এই সঙ্কটের টেকসই সমাধানে নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। তারা প্রথমবারের মতো ন্যানো বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া সার উদ্ভাবনের দাবি করেছেন, যার মাধ্যমে ইউরিয়া সারের অপচয় অন্তত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে।
গতকাল বুধবার ন্যানো বায়োচার সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া উদ্ভাবনের বিষয়ে বিস্তারিত জানান গবেষক দলের প্রধান ও বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) আর্থিক সহায়তায় ২০২৩ সাল থেকে এ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণা দলে আরো রয়েছেন- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ খোরশেদ আলম, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) সিএসও ড. শেখ মনজুরা হক, বাকৃবির মৃত্তিকা বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহসিনা শারমিন হক, পিএইচডি ফেলো মো: আমজাদ হোসেন এবং বুয়েটের শিক্ষার্থী মো: রোকনুজ্জামান রিপন।
অধ্যাপক ড. খায়রুল হাসান জানান, দু’টি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা ন্যানো ইউরিয়া তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের তৈরি ন্যানো ইউরিয়ার কণার আকার ২০ থেকে ৫০ ন্যানোমিটারের মধ্যে এবং এতে ন্যানো কার্বন কোটিং ব্যবহার করা হয়েছে। এই কার্বন কোটিং ইউরিয়ার নাইট্রোজেনমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীরগতির করে, ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলে নিয়ন্ত্রিতভাবে নাইট্রোজেন সরবরাহ সম্ভব হয়। এতে নাইট্রোজেনের অপচয় কমবে এবং কৃষকরা কম ইউরিয়া ব্যবহার করেই বেশি ফলন পাবেন। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমে কৃষকের আর্থিক লাভ নিশ্চিত হবে।
তিনি আরো জানান, এখনো মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি। তবে আশা করা হচ্ছে, আগামী বোরো মৌসুমের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হবে। লিটারেচার রিভিউ অনুযায়ী এই ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে অন্তত ২৫ শতাংশ কম ইউরিয়া প্রয়োজন হবে। বায়োচার কোটেড ন্যানো ইউরিয়া পরিবেশবান্ধব হওয়ায় গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এর ফলে কৃষক, পরিবেশ ও রাষ্ট্র- সবাই উপকৃত হবে এবং ইউরিয়া খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপও হ্রাস পাবে।
গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে ড. খায়রুল হাসান বলেন, হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট-ইউরিয়া, ইউরিয়া-ন্যানো বায়োচার ও হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট-ইউরিয়া-ন্যানো বায়োচার- এই তিন ধরনের ন্যানো হাইব্রিড ম্যাটেরিয়ালস সফলভাবে ল্যাবরেটরিতে উৎপাদন করা হয়েছে। এফটিআইআর বিশ্লেষণে শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধন ও ফাংশনালাইজেশন নিশ্চিত হয়েছে এবং টিইএম বিশ্লেষণে কণার আকার ৩০-৩২ ন্যানোমিটারের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা গাছের কোষে সহজে প্রবেশ করতে সক্ষম।
বর্তমানে প্রচলিত ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ। বাকি নাইট্রোজেন অ্যামোনিয়া গ্যাস, লিচিং, রান-অফ ও ডিনাইট্রিফিকেশনের মাধ্যমে নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ শক্তিশালী গ্রিন হাউজ গ্যাস এবং বৈশ্বিকভাবে প্রতিবছর ২৬-৪০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ। এই সমস্যার সমাধানে প্রায় অপচয়হীন ন্যানো সার তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন গবেষণার একটি বড় সাফল্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ন্যানো কার্বন ইউরিয়া ব্যবহারের সুবিধা তুলে ধরে তিনি জানান, এতে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ৭৫-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অ্যামোনিয়া অপচয় ৮০-৯০ শতাংশ, নাইট্রেট লিচিং ৬৫-৭৫ শতাংশ এবং নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এর ফলে মাটির গুণাগুণ উন্নত হয়, ধানের ফলন ১০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং ফসলের প্রোটিনের পরিমাণ ৮-১২ শতাংশ বাড়ে।
পিএইচডি ফেলো মো: আমজাদ হোসেন বলেন, ভারত থেকে তরল ন্যানো ইউরিয়া এলেও ন্যানো বায়োচার সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া সংশ্লেষণে তারাই প্রথম সফল হয়েছেন। মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় সাফল্য এলে এটি দেশের কৃষির জন্য একটি মাইলফলক হবে।
বাকৃবির মৃত্তিকা বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহসিনা শারমিন হক বলেন, নাইট্রোজেন একটি ম্যাক্রো পুষ্টি উপাদান। তাই এটি মাইক্রো পুষ্টির মতো পাতায় প্রয়োগ করলে মাটির উর্বরতায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ন্যানো ইউরিয়া মাটি ও ফসলের গোড়ায় প্রয়োগে ভালো ফল দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কেজিএফের নির্বাহী পরিচালক নাথু রাম সরকার বলেন, এই প্রযুক্তি সরাসরি কৃষকদের উপকার করবে। ন্যানো আকারে সার প্রয়োগের ফলে ব্যবহারের দক্ষতা বাড়বে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশদূষণ কমবে। কেজিএফের সিনিয়র স্পেশালিস্ট ড. মো: মনোয়ার করিম খান বলেন, এই বায়োচার কোটেড ন্যানো ইউরিয়া ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন ছাড়ে, ফলে দীর্ঘ সময় গাছ প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি পায়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো: আবদুস ছালাম বলেন, টেকসই ও লাভজনক কৃষি নিশ্চিত করতে উৎপাদন ব্যয় কমানো জরুরি। ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করলে এক দিকে ইউরিয়ার ব্যবহার কমবে, অন্য দিকে পরিবেশ সুরক্ষিত হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট মাত্রা নির্ধারণ করে কৃষকদের নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।