তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ভাঙনে দিশেহারা মানুষ

সপ্তমবারের মতো তিস্তায় বাড়ল পানি

Printed Edition
back-1
তিস্তা তীরবর্তী অনেক স্থানে পানি কমলেও শুরু হয়েছে ভাঙন : নয়া দিগন্ত

রংপুর ব্যুরো

উজানের ঢল আর বৃষ্টিতে আবারো পানি বাড়ল তিস্তায়। এ নিয়ে সপ্তমবারের মতো বাড়ল তিস্তার পানি। এতে অববাহিকার চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকেছে। আমনের আবাদ পানির নিচে। শুরু হয়েছে ভয়াবহ ভাঙন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, গতকাল সকাল ৬টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার এক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সকাল ৬টায়ও ছিল একই অবস্থা। বেলা ১২টায় তা ৮ সেন্টিমিটার, বিকেল ৩টায় ১১ সেন্টিমিটার এবং সন্ধ্যা ৬টায় ১৭ সেন্টিমিটার নিচে নেমে আসে। এই পানি ভাটির দিকে প্রবাহিত হয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করছে।

তিস্তায় এই পানি বৃদ্ধির ফলে নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা; লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, সদর, রংপুরের গংগাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা : কুড়িগ্রামের রাজারহাট, চিলমারী, উলিপুর এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের হরিপুর পর্যন্ত তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল এবং নিচু এলাকাগুলোতে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে সদ্য রোপণকৃত হেক্টরে হেক্টর আমনের আবাদ। তলিয়ে গেছে আমনের অনেক বীজতলা। শাকসবজি খেত। শত শত পুকুর উপচে চলে গেছে মাছ। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অববাহিকার চাষিরা।

গংগাচড়া লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলি গ্রামের চাষি মহসীন আলী জানান, এবার সাতবার তিস্তা অববাহিকায় পানি কমলো ও বাড়ল। এ কারণে বড় আবাদের ৭০ ভাগই তারা তুলতে পারেননি। বাদামের আবাদ তারা ঘরে তুলতে পারেননি। অর্ধেকেরও বেশি ভুট্টা পানিতেই তলিয়ে গেছিল। সপ্তমবারের মতো পানি বৃদ্ধি হওয়ায় সদ্য লাগানো আমনের আবাদ এখন অথৈ পানির নিচে।

গঙ্গাচড়ার নোহালি ইউনিয়নের কাচারিপাড়া এলাকার মৎস্য চাষি সৈয়দ আলী জানান, আমার ৪ বিঘা জমিতে পুকুরের আবাদ ছিল। কিন্তু পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পার উপচিয়ে সব মাছ চলে গেছে।

নোহালী ইউনিয়নের আজিজুল পাড়ার কলেজ শিক্ষার্থী আল আমিন জানান, রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়া এবং কর্দমাক্ত হওয়ায় ইউনিয়নটির ২,৭, ৮ নং ওয়ার্ডের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর স্কুলে যাওয়া নিয়ে আহা দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।

এবার পানি বৃদ্ধি ও কমার সাথে সাথে সব থেকে বেশি ধরেছে ভাঙন। এরই মধ্যে নোহালী ইউনিয়নের ব্রিজ বাজার, কাচারিপাড়া, চর বাগদোহারা, চরণহালী, কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনিয়া, গজঘণ্টা ইউনিয়নের ছালাপাকসহ শুধু রংপুর অংশে ২০টি পয়েন্টে ভাঙন ধরেছে। ভাঙন ধরেছে মহিপুর তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তর পশ্চিম রক্ষা বেড়িবাঁধেও। ভাঙন ধরেছে কোলকন্দ ইউনিয়নের ডানতীর রক্ষা বাঁধের এসপার বাঁধে।

ভাঙনের শিকার নোহালি ইউনিয়নের কাঁচারিপাড়া গ্রামের আলহাজ মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তার স্ত্রী সুলতানা বেগম জানান, ৪০ বছর ধরে তিনি সেখানে তিন সন্তান-সন্ততি নিয়ে বসবাস করছেন। পাকা বাড়ি ছিল তার। তিস্তার কড়াল গ্রাসে গেল পাঁচ দিনের ব্যবধানে তার বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে তিস্তায়। এখন তিনি নিঃস্ব। কিছুই রইল না পরিবারটির।

পানি এবং ভাঙনে দিশেহারা এসব পরিবারের পাশে এখন পর্যন্ত দাঁড়ায়নি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।

নোহালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী জানান, সময়ের স্বল্পতার কারণে আমি ভাঙন এলাকায় যেতে পারিনি। তবে মঙ্গলবার ইউএনও সারের নির্দেশে সেখানে গিয়েছিলাম।

গংগাচড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আক্তার জানান, ‘এবার বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন ধরেছে। বারবার পানি ওঠানামা করছে। নোহালি চেয়ারম্যান এবং পিআইওকে আমি নির্দেশনা দিয়ে মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছিলাম। ওখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও সাহেবও গিয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পুরো বর্ণনা আমি পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে সাবমিট করেছি। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ দেয়ার বন্দোবস্ত করার কথা বলেছি।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, এবার তিস্তায় পানি কমা বৃদ্ধির সাথে সাথে পানিবন্দী হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক ভাঙন ধরেছে। বিষয়গুলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমরা জানিয়েছি। তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানান, তিস্তার ডান তীর আমরা সংরক্ষণ করে রেখেছি। কিন্তু বাম তীরের নদীর ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় বেশ কিছু জায়গায় জনবসতি গড়ে উঠেছে। সেসব এলাকায় ভাঙন ধরেছে। সেগুলো আমরা কিভাবে কাজ করব তা জানতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছি। এরই মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, তিস্তার দুই পারে ২৪২ কিলোমিটার অববাহিকায় অন্তত দেড় শতাধিক স্পটে এবার ভাঙন ধরেছে।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মো: শহিদুল ইসলাম জানান, তিস্তাসহ রংপুর বিভাগের নদ-নদীগুলোর ভাঙন এবং পানির বাড়া কমা পরিস্থিতি আপডেট প্রতিদিন সকালে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করছি। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার আলোকে ভাঙন রোধে কাজ চলমান আছে। বাকি জায়গাগুলোতে কাজ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে মাঠ প্রশাসনকে সতর্কভাবে তিস্তা অববাহিকায় দেখভাল করার জন্য বলাও হয়েছে।