মুছা কলোনির সাথে জড়িয়ে আছে লোমহর্ষক কাহিনী

পাকিস্তানে বাঙালি চোখে স্বপ্ন মনে হতাশা

Printed Edition

মুছা কলোনি, যার সাথে জড়িয়ে আছে এক বেদনাতুর তথা লোমহর্ষক কাহিনী। এর জন্মলগ্ন রক্তমাখা। তিনহাট্টি পুলের নিচে ঠিকানা লাগিয়েছিল কয়েকটি পরিবার। ওপর দিয়ে ছুটে চলত শকট, পায়ে হাঁটা মানুষের বহর। হঠাৎ এক কুক্ষণে মরাগাঙে জোয়ার আসে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় কাঁচা ঘরদুয়ার। অগত্যা নিঃস্ব মানুষগুলো ঠাঁই নেন করিমাবাদের ট্রেনলাইনের ধারে খোলা মাঠে। সময়ের ক্রমধারায় আরো অনেক বাঙালি সেখানে ঘর বাঁধেন। ফলে বেড়েই চলে বসতির পরিসর। সাথে সাথে পুলিশের পায়চারীও শুরু হয়।

দিনে দিনে ওদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলে। মুফতাখোর ওরা, সব কিছু ফ্রিতে ব্যবহারে তৎপর। মা-বোনেরা হন ওদের যৌন আকাক্সক্ষার শিকার। এতেই বাধে যত গণ্ডগোল। শেষে এক কুক্ষণে বস্তির দু’জন জাদরেল নারী এক পুলিশের গলায় ধারালো বঁটি চালায়। সরাসরি খুন! তা আবার সরকারি লোক! ঘটনার জের টেনে অদূরে পুলিশ পজিশন নেয়। টেনশন তুঙ্গে ওঠে। পুলিশ বনাম বাঙালি লড়াইয়ের দামামা বাজে। ঝটপট তৎকালীন গভর্নর মুছা খান ঘটনাস্থলে আসেন। তাকে দেখে বস্তির মানুষগুলো মুহুর্মুহু মুছা খান জিন্দাবাদ স্লোগান দেন। সেই সূত্র ধরে এলাকা নাম পায় মুছা কলোনি। যতদূর জানা যায়, আত্মরক্ষার জন্য নারীদের নৃশংসতার এহেন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ধোপে টেকেনি।

এলাকাটিকে ‘খুদে বাংলাদেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নামটির পেছনে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্রোতধারা; কথ্য কথামালার প্রতিধ্বনি।

মুছা কলোনির পর যাদের নাম উল্লেখযোগ্য সেগুলো হলো- মচ্ছর কলোনি, চিটাগং কলোনি, শ-কোয়ার্টার, বাঙালিপাড়া, রহমানিয়া কলোনি, গোদরা ক্যাম্প প্রভৃতি। তবে আরো একটি নব্য বস্তি আছে বেলুচিস্তানের হাব নদীর পাদদেশে; করাচির সীমা ছাড়িয়ে, গড়ে উঠেছে সে জনপদ। অতীতে সিন্ধি হোটেলের মরাগাঙের তটে ছিল তাদের আবাসস্থল। সেখান দিয়ে নব্য সড়ক তৈরির প্রয়োজনে তাদেরকে ধূসর মরু বালিয়াড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়। এখানেই দেখা মেলে সায়রা খাতুন নামে অস্থিরমনা এক নারীর সাথে।

গরিব এই নারীর পরনে নোংরা শাড়ি, গাল ভরা পান। ঠোঁটের কিনারায় চুন পিক নিয়ে অনর্গল বলে চলছেন।

তিনি বলেন, অদূরে কামের বাসায় যাই, কাম করি, তাতেই ঘরে চুলা জ্বলে। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরি। আগে ফিশারিতে মাছ বাছাইয়ের কাম করেছি অনেক বছর। এখন আর পারিনে। বরফ দেয়া মাছের ডালিতে হাত দেয়া আর দিতে পারি না। বয়স হইছে তো, আর কত!

ভরা যৌবনে সে নাকি ছিল ভীষণ অস্থির প্রকৃতির। গায়ে অনেক জোর ছিল, কোনো বাধাই মানত না। নিজের সন্তান প্রসব নাকি নিজ হাতেই সেরে নিতেন। এভাবে সাত মেয়ে আর এক ছেলেকে জন্ম দিয়েছেন। ‘শুধু একটি ছেলের আশায় এতগুলো মেয়ের জন্ম দিছি’- কথাগুলো বলতে বলতে গালের নিঃসৃত পিককে কোনোমতে সামলিয়ে হেসে ওঠে; ‘বলে ছেলেটাই আমার যজ্ঞের ধন।’

ঠিকই তো, মেয়েরা তো চলে গেছে পরঘরে। ছেলেটা লালুক্ষেতে কাজে যায়। সপ্তাহ শেষে ঘরে ফেরে। মাঝ দিনগুলো একা ঘরে। রাতে বালিশে মাথা রাখতেই অতীত স্মৃতি ভিড় করে। বলেন, ‘রাতে ঠাণ্ডার দিনে মাটির মেঝেতে ডালপালা বিছিয়ে সবাই শুয়ে যেতাম। গরম কাপড় কেনার সামর্থ্য বাবার ছিল না। মা বকরি চরাতে যেতেন, বাপ যেতেন তাঁতে। তা দিয়ে তেল আনতে পান্তা ফুরাত।’ কথাগুলো বলতে বলতে হঠাৎ তিনি চুপ হয়ে যান। চেয়ে দেখি চোখে তার অশ্রুর নির্ঝর।

তিনি আরো বলেন, এ অবস্থায় একরাতে দালালের সাথে পাড়ি জমালাম। ঘুটঘুটে আঁধারে ভারতের সীমানা বরাবর নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে আমাদের কাফেলা। মনে স্বপ্ন, পাকিস্তানে যাবো। বলা হয়েছিল পাকিস্তানে কামই কাম। নিজে খেয়ে পরে মা-বাপকেও দিতে পারবি। কিন্তু তখন কি জেনেছি বাস্তবটা কী? যাহোক, চলার পথে বর্ডারে এক কুত্তা সজোরে আমার রানে কামড় বসিয়ে দেয়। কিন্তু ভয়ে উচ্চবাচ্চ্য করতে পারিনি পাছে পুলিশের হাতে ধরা খায়।’

তার কাহিনী বড় লম্বা। সংক্ষেপে এক বাঙালি সাংবাদিকের সাথে লালুক্ষেতে তার অযাচিত দেখা। সেই সুবাদে ডিফেন্সের এক বাংলায় তার কাজ মেলে। কথার ফাঁকে খুলে দিলেন তিনি বাংলোয় কার্পেটে মোড়া নৈশ কার্যকলাপের ফিরিস্তি। সেখানে তাকেও যৌন হেনস্তার শিকার হতে হয়। এ কাহিনী শুধু তার একার নয়। বস্তিবাসীদের জন্য এটি নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু তার এক উক্তি আমার মানসিকতাকে নাড়া না দিয়ে পারেনি। তার ভাষায়, ‘যৌন লণ্ডভণ্ডে সমাজের উঁচু ও নিচুতলার মানুষ মিলেমিশে একাকার। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে বড় ধরনের মিল আছে। উভয়ের চোখে এ কোনো ব্যাপারই না। একজন পয়সায় নগ্ন হয়, অন্যজন মন সন্তুষ্টির কাহিনী পড়ে।’ সায়রার মা গত হয়েছেন। বাবা বয়সের ভারে টিমটিম করছেন বাংলাদেশে আড়াই হাজারের কড়িতলা গ্রামে। চোখে-মুখে জিজ্ঞাসা তার, সে কি কোনো দিন আর আপনজনদেরকে দেখতে পাবেন না? এ বাক্য তার একার নয়, এখানকার সব বাঙালিই। কবে সরাসরি বিমান চালু হবে? কবে চলাচলে সব বাধা শেষ হবে?

বাংলাদেশের শেষোক্ত গণজাগরণের পরপর গণমনে আশার সঞ্চার হয়। পাক-বাংলা সরকারের কার্যকলাপে সুসম্পর্কের আভাস মেলে। ব্যবসা প্রসারের কথা চলে। সামরিক খাতে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় খোলে। বিমান আজ চলে, কাল চলে। তবুও কেন জানি কোথাও পথে কাঁটা! আরো বড় কথা, বছর গড়িয়ে নতুন বছরেও পাকিস্তানে বাসরত বাঙালিদের অবস্থান বিষয়ে কোনো কথাই হয়নি। তবে কি সাধারণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ভেস্তে যাবে?

সত্যি বলতে কি পাক-বাঙালিদের না আছে কোনো প্রকৃত পরিচয়; তারা পাকিস্তানি নয়, আবার নিজ ঘরেও বিদেশী। দুখণ্ড জমির আইলে দাঁড়িয়ে যেন সময় ক্ষেপণ করে চলেছেন তারা। জাতীয় পরিচয়পত্র নেই; তাই ভোট দেয়ার অধিকারও নেই। হারিয়েছে সরকারি চাকরির সুযোগ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও গ্রহণযোগ্যতা তেমন নেই। যদিওবা কোথাও কাজ মেলে তাতে বেতনে ডাকা পড়ে। বিদেশী তমঘাধারীদের পৃথিবীর সর্বত্র একই চিত্র!

কথা হলো জহুর বাঙালির সাথে। করাচিতে বেশি সময় আখের মেশিনে কাটিয়েছেন তিনি। আগে অন্যের মেশিনে, পরে নিজের মেশিনে সংসার চালিয়েছেন। এখন বয়সের ভারে কাজ করতে পারেন না। সঙ্গিনীকে যেতে হয় পরের ঘরে কাজে। তারও একই প্রশ্ন- দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে কবে? পরে হাছন আলীর সাথে দেখা। একই প্রশ্ন তার মুখে। কবে নাগাদ সরাসরি বিমান চালু হবে?

কিন্তু একটি কথা জরুরি, না বললেই নয়। এদের কেউই কিন্তু বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্গ্রিব নয়। কেননা এখানে যেনতেন প্রকারে ওরা পথ খুঁজে নিয়েছেন। পেয়েছেন পথের দিশা। জীবনের গাড়ি চলছে তো। এটিকে নতুন করে খোয়াতে চান না ওরা।

পরিশেষে হাছন আলীর কথায় ফিরতে হলো। বড় উদ্গ্রিব ছিল ও। শোনাতে চাইল তার চলতি জীবনের দাস্তান। প্রথম স্ত্রী বাচ্চাকাচ্চা ফেলে চলে গেল। ফের বিয়ে করলাম। নতুন করে সন্তান এলো ঘরে। প্রয়োজনে দালাল ধরে চোরাইপথে বাংলাদেশে গেলাম। কিন্তু ফেরা আর হলো না। দূর থেকে শুনলাম দ্বিতীয় স্ত্রীও নতুন ঘর পেতেছে। মনে মনে ধিক্কার দিলাম নিজ কপালকে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেছে। ফের বাগান পথেই সুযোগ বুঝে পাড়ি দিলাম। পৌঁছেও গেলাম করাচি। ইতোমধ্যে স্ত্রীর দ্বিতীয় বরও গত হয়েছেন। ঘরে গিয়ে উঠতে যাবো কিন্তু এলো বাধা। ধর্মের লাঠি হাতে তেড়ে এলো মুসুল্লিরা। বলল নতুন করে নিকাহ করতে হবে। কিন্তু কেন? তবুও তাদের সিদ্ধান্তেই নিকাহ করতে হলো।

সংক্ষেপে সব যুক্তি অচল, ধর্মের অপব্যবহারই চলতি নিয়ম। এটিই বাস্তব।