শাহবাজ-মুনিরের সাথে আরাকচির বৈঠক মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফর বাতিল

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাথে বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। বৈঠক শেষে দেয়া এক বিবৃতিতে আরাকচি জানান, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত সর্বশেষ অগ্রগতি এবং যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে ইরানের ‘নীতিগত অবস্থান’ ব্যাখ্যা করেছেন। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার পর চলমান আলোচনা প্রক্রিয়ার ওপর ‘আস্থা প্রকাশ’ করেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এর আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সাথে বৈঠক করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর এক বিবৃতিতে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ও প্রস্তাবনাগুলো তুলে ধরে তেহরান।

এদিকে পাকিস্তান যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের সফর গতকাল হঠাৎ বাতিল করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এরআগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়, বৈঠকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য ‘যুদ্ধবিরতিসংক্রান্ত সাম্প্রতিক অগ্রগতি’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যে আরাকচি ইরানের নিজস্ব ‘অভিমত ও বিবেচ্য বিষয়গুলো’ পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করেছেন। বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন যে, মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে ইসলামাবাদ।

মার্কিন প্রতিনিধি দলের পাকিস্তান সফর বাতিল : ইরানের সাথে শান্তি আলোচনায় অংশ নেয়ার অপেক্ষায় থাকা মার্কিন প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ স্যোশালে দেয়া এক পোস্টে প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর বাতিলের তথ্য নিশ্চিত করেন তিনি।

ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি এইমাত্র পাকিস্তানে ইরানিদের সাথে দেখা করতে যাওয়া আমার প্রতিনিধিদের সফর বাতিল করেছি।’ সফর বাতিলের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভ্রমণে অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে, প্রচুর কাজ পড়ে আছে! এ ছাড়াও তাদের (ইরানের) ‘নেতৃত্বের’ মধ্যে চরম অন্তর্কোন্দল এবং বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। এমনকি তারা নিজেরাও জানেন না, এখন তাদের দায়িত্বে কে আছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমাদের হাতে সব সুযোগ রয়েছে, তাদের হাতে কিছুই নেই! তারা যদি কথা বলতে চায়, তাহলে তাদের কেবল একটি টেলিফোন কল করলেই হবে। ‘কিছু না বলে বসে থাকার জন্য ১৮ ঘণ্টার ফ্লাইট আর নয়।’

ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ ত্যাগ করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন।

পাকিস্তান ত্যাগ করল ইরানের প্রতিনিধিদল : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ সফর শেষ করে পাকিস্তান ত্যাগ করেছে। শনিবার দিনভর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান ও ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরসহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠকের পর পাকিস্তান ত্যাগ করেন তারা।

সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব নাকচ ইরানের : বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছালেও, তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা আমেরিকার সাথে কোনো সরাসরি বৈঠকে বসছে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই দ্বন্দ্বের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বর্তমানে টালমাটাল। ইরান গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রফতানিতে বাধা দেয়ায় তেলের দাম কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ৯ সপ্তাহ ধরে চলা এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শান্তি আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সংশয় : যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সঙ্গাত নিরসনে শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। গত সপ্তাহে এই দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তেহরান আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের অনুরোধে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ দুই সপ্তাহ বাড়িয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে চলমান সঙ্ঘাত অবসানে নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরির জন্য আরো কিছুটা সময় পায় ইরান।

হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, সম্প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং আলোচনার পথে কিছুটা অগ্রগতিও হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি মূলত পাকিস্তানের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার জন্য সেখানে এসেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কোনো আলোচনায় তিনি অংশ নেবেন না। এর অর্থ হলো- ইরান কোনো বার্তা পাঠাতে চাইলে তা পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই পৌঁছাতে হবে। তাই এই পরোক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে দ্রুত কোনো বড় ধরনের সাফল্যের সম্ভাবনা খুব কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধ থেকে একটি ‘সম্মানজনক’ প্রস্থানের পথ খুঁজছে বলে দাবি করেছে ইরান। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার জন্য মার্কিন প্রতিনিধিদের পাকিস্তান সফর শুরুর আগে তেহরান দাবি করেছে। শনিবার ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে ইরানের সংবাদমাধ্যম ইসনা (আইএসএনএ) বলেছে, বর্তমানে আমাদের সামরিক শক্তি একটি প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। শত্রু এখন যুদ্ধের এ চোরাবালি থেকে বাঁচতে এক সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছে, যেখানে তারা আটকা পড়েছে।

নৌঅবরোধের কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের : ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর অব্যাহত অবরোধের প্রেক্ষাপটে কঠোর সামরিক জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, দেশটির খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল মিলিটারি কমান্ড এক বিবৃতিতে সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সতর্ক করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমেরিকান সেনাবাহিনী যদি এই অঞ্চলে তাদের অবরোধ, দস্যুতা এবং জলদস্যুতা অব্যাহত রাখে, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই শক্তিশালী ইরানি সশস্ত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হবে। উল্লেখ্য, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ করার প্রতিক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানকে একটি শান্তি চুক্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাস্তবে তা খুব একটা কাজে আসেনি। বরং ইরানের কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই অবৈধ অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে বসবে না।

ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার সামান্যই ব্যবহার করেছে ইরান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার একটি বড় অংশ এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’ এ তথ্য জানিয়েছে।

ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালাই-নিক বলেন, ইরান বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের রক্ষণাত্মক ও পাল্টা আঘাত হানার প্রস্তুতি বজায় রেখেছে। তালাই-নিক বলেন, দেশীয় প্রযুক্তিতে ইরান বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি ধরনের অস্ত্র উৎপাদন করছে। তিনি আরো বলেন, দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান এ অস্ত্র উৎপাদনে সহায়তা করছে। এমনকি কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উৎপাদন প্রক্রিয়া থেমে থাকবে না। হরমুজ প্রণালী সম্পর্কে মুখপাত্র বলেন, এটি ইরানের ‘নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার’। এ প্রণালী ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান পার্শ্ববর্তী জলসীমার পরিস্থিতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে আসছে।