ব্রহ্মপুত্রে ধু-ধু বালুচর
নাব্যতা সঙ্কটে ফুলছড়ি চরাঞ্চলে জনজীবন পর্যুদস্ত
Printed Edition
আমিনুল হক ফুলছড়ি (গাইবান্ধা)
একসময়ের প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদ আজ তার নিজস্ব সত্তা ও যৌবন হারিয়ে অনেক স্থানে মরা খালের রূপ নিয়েছে। উত্তাল ঢেউ আর প্রবল স্রোতের যে রূপ এক দিন ছিল নদীর পরিচয়, তা এখন কেবল স্মৃতি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উজানে পানিপ্রবাহের অস্বাভাবিক হ্রাস এবং বছরের পর বছর উজান থেকে নেমে আসা পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পড়ায় অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এই নদ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায়।
নদের বুকে জেগে ওঠা বিশাল ডুবোচর ও বিস্তীর্ণ বালুচরের কারণে এরেন্ডাবাড়ী, ফজলুপুর ও ফুলছড়ি ইউনিয়নের চরাঞ্চলে নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ। অথচ এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা পুরোপুরি নির্ভর করত নৌপথের ওপর। নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় এখন চরবাসীদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ তপ্ত বালু মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে মূল ভূখণ্ডে যেতে হচ্ছে।
বর্তমানে ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে জেগে ওঠা বালুচরগুলো ধু-ধু মরুভূমির মতো। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও বুকসমান বালু। বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এই যাত্রা এক ভয়াবহ কষ্টের নাম। স্থানীয় বাসিন্দা রিপন মিয়া বলেন, আগে নৌকায় আধা ঘণ্টায় পার হতাম। এখন বছরের অর্ধেক সময় হেঁটে চলতে হয়। রোদে বালু এত গরম থাকে যে পায়ে ফোস্কা পড়ে।
যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে। ফুলছড়ির চরাঞ্চলে উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, সবজি, মরিচ ও পাট জেলার গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা মেটায়। কিন্তু নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় ফসল বাজারে নিতে গিয়ে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে গেছে। চর খাটিয়ামারীর কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ফসল ফলাই ঠিকই, কিন্তু বাজারে নিতে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা, খরচই ওঠে না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় দেশী মাছের প্রজননও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, কর্মহীন হয়ে পড়ছেন শত শত জেলে পরিবার। চরবাসীর দাবি, দ্রুত পরিকল্পিত খনন করে ব্রহ্মপুত্র ও তাদের জীবন- দুটোই রক্ষা করা হোক।
শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় নেমে এসেছে দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট। খোলা বালুচর পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে। জরুরি রোগী ও প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালে নিতে দেরি হওয়ায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, উজানে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া ও অতিরিক্ত পলি জমার কারণে নাব্যসঙ্কট তীব্র হয়েছে। মাঝে মধ্যে ড্রেজিং করা হলেও পুরো নদীজুড়ে এই সঙ্কট নিরসন ব্যয়বহুল ও বড় চ্যালেঞ্জ।