হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ‘জরুরি টিকাদান’ কর্মসূচি শুরু কাল

Printed Edition
first-5
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ‘জরুরি টিকাদান’ কর্মসূচি শুরু কাল

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল
  • ২৪ ঘণ্টায় আরো ৪ শিশুর মৃত্যু
  • আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন বয়স্করাও

করোনা মহামারীর ভয়াবহতা পেরিয়ে আসার পর দেশের স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে এক গভীর ও মারাত্মক উদ্বেগ তৈরি করেছে অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি হাম। গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ ও মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

এ দিকে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সবধরনের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় সরকার আগামীকাল রোববার থেকে জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।

চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রকোপ বাড়তে থাকলেও মার্চ মাসে তা চরম আকার ধারণ করে। গত তিন মাসে হাম ও এর ফলে সৃষ্ট নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৫০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল মার্চ মাসেই মারা গেছে ৩২ জন শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিøউএইচও) ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে দেশের ৫৬টি জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এক চরম পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ও পরিস্থিতি

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, হিসাবের বাইরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই এ পর্যন্ত ২১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুরুতে জ্বর, সর্দি ও কাশি থাকলেও পরে তা মারাত্মক শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে, যা শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সবধরনের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বৃহস্পতিবার অধিদফতরের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে জানানো হয়, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও এর অধীনস্থ সব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। ডা: জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী, পরিচালক (প্রশাসন), স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয় যে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এটি জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

হামের এই দেশব্যাপী ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসেছে এবং বেশ কিছু জরুরি ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন সচিবালয়ে ইউনিসেফ প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক শেষে গত বুধবার ঘোষণা দেন যে, আগামী রোববার থেকে দেশব্যাপী একটি জরুরি হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একটা ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। ইতিহাসে আগে কখনো এত স্বল্প সময়ের মধ্যে এ রকম ক্যাম্পেইন চালু হয়নি।

হামে আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ (প্রায় ৩০ শতাংশ) নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এই মৃত্যু ঠেকাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আইসিডিডিআর,বি-এর সাথে একটি যুগান্তকারী যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ উদ্ভাবিত অত্যন্ত সাশ্রয়ী ‘বাবল সিপ্যাপ’ প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রচলিত মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরের বিকল্প এই প্রযুক্তির প্রতিটি ইউনিটের নির্মাণ খরচ মাত্র ৩০০ টাকা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ২ এপ্রিল থেকে শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে দেশের ৩০টিরও বেশি সরকারি হাসপাতালের পরিচালকদের নিয়ে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে।

প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ

বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিকভাবে ২০২০ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। পরে তা বাড়িয়ে ২০২৬ সাল করা হয়; কিন্তু নির্মূল হওয়া তো দূরের কথা, দেশ এখন উল্টো এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সাথে লড়াই করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে হামের টিকাদানের কভারেজ ছিল মাত্র ৫৭.১ শতাংশ, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ ও এমআর-২ টিকার কভারেজ ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর সেক্টর প্রোগ্রাম হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়ায় ভ্যাকসিন পরিবহন খরচের অভাবে ঠিকমতো ভ্যাকসিন পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ৯০-৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন; কিন্তু বর্তমানে তা অনেক ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এর ফলে কয়েক লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। এ ছাড়া হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ১৫ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। ডাক্তারদের মতে, বর্তমানে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে যাওয়ায় এই প্রাদুর্ভাব দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে।

জেলাভিত্তিক হামের পরিস্থিতি

হামের সংক্রমণ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও কয়েকটি জেলার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ ও মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ তথ্যে ভিত্তিতে নিচে প্রধান জেলাগুলোর চিত্র তুলে ধরা হলো।

ঢাকা : হাম সংক্রমণের মূল এপিসেন্টার বা উপকেন্দ্র হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা। ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের হার সর্বোচ্চ। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা মাত্র ১০০টি হলেও বর্তমানে সেখানে ১২০ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। বেড না পেয়ে মেঝে ও বারান্দায় রেখে শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে প্রায় ৪৫০ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী ভর্তি হয়েছেন, যার মধ্যে ৩১৫ জনের শরীরেই হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। অথচ গত পুরো বছরে এই হাসপাতালে হামের রোগী ছিল মাত্র ৬৯ জন। ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেও উপচে পড়া ভিড়, সেখানে এ পর্যন্ত ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

রাজশাহী : উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের প্রকোপ মারাত্মক রূপ নিয়েছে। রামেক হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে গত কয়েকদিনে এক দিনেই সর্বোচ্চ ৭০ জন হামের রোগী ভর্তির রেকর্ড হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চলতি বছর এই হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আইসোলেশন ওয়ার্ডের অভাবে সাধারণ ওয়ার্ডেই এদের চিকিৎসা দেয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

পাবনা : পাবনা জেনারেল হাসপাতালেও প্রতিদিন হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সম্প্রতি পাবনায় আরো ছয়জন হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। এখানকার চিকিৎসকদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি হলো, শুধু শিশুরাই নয়- প্রাপ্তবয়স্করাও হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এ পর্যন্ত পাবনা সদরে প্রায় ২৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোগীরা তীব্র জ্বর, গায়ে র‌্যাশ এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসছেন।

কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়ায় হামে আক্রান্ত হয়ে আফরান নামে আট মাস বয়সী এক শিশু মারা গেছে। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টায় কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। শিশুর অভিভাবকদের অভিযোগ- অবহেলার কারণে শিশু আফরান মারা গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে- রোগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করার পরেও তাকে অভিবাকরা না নেয়ায় এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : রাজশাহীর পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জেও হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার নিয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে সম্প্রতি প্রায় ৭০ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। জেলাটিতে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত চার শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে হাম আক্রান্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিক্যালে এক শিশুর মৃত্যুসহ আরো ৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। গত ১৭ মার্চ থেকে এই হাসপাতালে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় এক বেডে একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

যশোর ও চট্টগ্রাম : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালেও হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।