ছোট্ট বলের বড় পৃথিবী : সাঈদ বারী

Printed Edition
agdum-1
ছোট্ট বলের বড় পৃথিবী : সাঈদ বারী

১১ জুন শুরু হয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব। এবারের বিশ্বকাপ হচ্ছে একেবারেই অন্য রকম। কারণ এই প্রথম ৪৮টি দেশ অংশ নিয়েছে। খেলা হচ্ছে তিনটি দেশে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে পর্দা উঠেছে এই মহা-আয়োজনের।

একদিন বিকেলে রাহাত নামে এক ছোট্ট ছেলে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা বাবা, বিশ্বকাপ নিয়ে এত হৈচৈ কেন? বাবা মুচকি হেসে বললেন, ‘তুমি কি জানো, ফুটবল শুধু একটা খেলা নয়। এটি কোটি কোটি মানুষের আনন্দ, স্বপ্ন আর ভালোবাসার নাম।’ রাহাত অবাক হয়ে শুনতে লাগল। অনেক বছর আগে বিভিন্ন দেশের মানুষ ভাবল, শুধু নিজেদের মধ্যে খেলে আনন্দ পাওয়ার চেয়ে পৃথিবীর সেরা দলকে খুঁজে বের করা আরো মজার। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। বিশ্বকাপ এলেই যেন পুরো পৃথিবী এক মাঠে নেমে আসে। কেউ ব্রাজিলকে সমর্থন করে। কেউ আর্জেন্টিনাকে। কেউ জার্মানিকে। কেউ আবার নিজের দেশের পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে পড়ে। একটি বল। একটি মাঠ। আর কোটি কোটি মানুষের উচ্ছ্বাস। এটাই বিশ্বকাপের জাদু। রাহাত আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে সবাই এত উত্তেজিত হয় কেন?’ বাবা বললেন,‘কারণ বিশ্বকাপ চার বছর পরপর আসে। তাই অপেক্ষাটাও অনেক বড়। ভাবো তো, তোমার সবচেয়ে প্রিয় উৎসব যদি চার বছর পরপর আসত, তাহলে কেমন লাগত? ঠিক তেমনই অনুভূতি ফুটবলপ্রেমীদের। ‘বিশ্বকাপে শুধু খেলা হয় না। নতুন নতুন নায়কও জন্ম নেয়। কখনো কোনো তরুণ খেলোয়াড় হঠাৎ সবাইকে চমকে দেয়।’

কখনো কোনো গোলরক্ষক অসম্ভব একটি বল ঠেকিয়ে দেয়। কখনো শেষ মুহূর্তের একটি গোল পুরো দেশের মানুষকে আনন্দে কাঁদিয়ে ফেলে। এ কারণেই বিশ্বকাপের গল্প কখনো পুরোনো হয় না। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আরো বিশেষ। এবার ৪৮টি দল খেলবে। আগে খেলত ৩২টি দল। ফলে আরো বেশি দেশ সুযোগ পাবে নিজেদের প্রতিভা দেখানোর। আরো বেশি শিশু নিজেদের দেশের খেলোয়াড়দের দেখে অনুপ্রাণিত হবে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো বন্ধুত্ব। খেলার মাঠে দু’টি দল প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু খেলা শেষে তারা একে অপরের সাথে হাত মেলায়। এটি আমাদের শেখায়, জেতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্মান ও সৌহার্দ্য আরো গুরুত্বপূর্ণ। ছোটদের জন্য এই শিক্ষাটি খুব মূল্যবান। বিশ্বকাপ আমাদের দলবদ্ধভাবে কাজ করতেও শেখায়। একজন খেলোয়াড় একা ম্যাচ জিততে পারে না। গোলরক্ষক, ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার, ফরোয়ার্ড- সবাই মিলে একটি দল।

জীবনেও ঠিক তাই। পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক- সবাইকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হয়। বিশ্বকাপের আরেকটি মজার বিষয় হলো বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি জানা। খেলা দেখতে দেখতে আমরা নতুন দেশের নাম শিখি।

নতুন পতাকা দেখি। নতুন ভাষা সম্পর্কে জানি। পৃথিবীটা যে কত বড় এবং বৈচিত্র্যময়, তা বুঝতে পারি। তাই বিশ্বকাপ এক অর্থে একটি বিশাল শিক্ষালয়ও। রাহাত তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়!’ বাবা হেসে বললেন, ‘একদম ঠিক বলেছ।’ বিশ্বকাপ আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়। একজন ছোট্ট শিশু হয়তো আজ পাড়ার মাঠে খেলছে। কিন্তু সে স্বপ্ন দেখছে একদিন বিশ্বকাপের মাঠে নামবে। অনেক বিখ্যাত ফুটবলারের গল্পও এমনই। তারা ছোটবেলায় সাধারণ মাঠে খেলত। অসংখ্য কষ্ট করেছে। পরিশ্রম করেছে। হাল ছাড়েনি। একদিন তারাই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হয়েছে। তাই বিশ্বকাপ আমাদের আরেকটি বড় শিক্ষা দেয়। স্বপ্ন দেখতে হবে। আর সেই স্বপ্নের জন্য কঠোর পরিশ্রমও করতে হবে।

কেউ নিজের প্রিয় দলের জার্সি পরে চিৎকার করবে। আবার কোনো ছোট্ট শিশু হয়তো প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ দেখবে। সেই শিশুর চোখে ফুটে উঠবে বিস্ময়। হয়তো সেদিনই তার মনে জন্ম নেবে নতুন একটি স্বপ্ন। হয়তো সে ভাববে, ‘একদিন আমিও ফুটবল খেলব। একদিন আমিও দেশের জন্য খেলব। একদিন আমিও বিশ্বকাপের মাঠে দাঁড়াব।’

এই স্বপ্নই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি আনন্দের উৎসব। বন্ধুত্বের বার্তা। পরিশ্রমের গল্প। স্বপ্নের ডানা। আর পৃথিবীর কোটি মানুষের হৃদয়কে এক সুতোয় গেঁথে দেয়ার এক অসাধারণ আয়োজন।