সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াবের প্রতিবাদ সভা

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সরকারের নৈতিক বৈধতা : দুই সঙ্কট মুখোমুখি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে পরিকল্পিত হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট এবং সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে প্রকাশ্যে হেনস্তার ঘটনার পর সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক বৈধতা- এই দুই সঙ্কট একসাথে সামনে এসেছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক যৌথ প্রতিবাদ সভায় এই সঙ্কটের গভীরতা তুলে ধরেন ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম ও সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)।

গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলাকে বক্তারা স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সংগঠিত আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেন। একই রাতে ডেইলি স্টার কার্যালয়েও হামলা চালানো হয়। ওই রাতে সংহতি জানাতে গিয়ে হামলাকারীদের হাতে হেনস্তার শিকার হন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর।

বক্তারা বলেন, এটি কেবল দু’টি সংবাদপত্রে হামলা নয় বরং গণমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে নীরব করার চেষ্টা।

‘এখন প্রশ্ন, সাংবাদিকরা বেঁচে থাকবে কি না’ : মাহফুজ আনাম

প্রতিবাদ সভায় মাহফুজ আনাম বলেন, “আমরা এত দিন মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে, সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।” তিনি জানান, ডেইলি স্টার ভবনে আগুন দেয়ার সময় ২৬-২৭ জন সংবাদকর্মী ভেতরে আটকে পড়েছিলেন এবং ফায়ার সার্ভিসকে ঘটনাস্থলে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এটা স্পষ্ট করে দেয় যে তাদের পুড়িয়ে মারার ইচ্ছা ছিল। সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিকদের ঘরে ঘরে গিয়ে হত্যার হুমকির প্রসঙ্গ তুলে ধরে মাহফুজ আনাম বলেন, এই পরিস্থিতি সাংবাদিক সমাজের জন্য এক ভয়াবহ সতর্ক সঙ্কেত। তিনি জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

‘অনির্বাচিত সরকারের শক্তি নৈতিক বৈধতা’ : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

এই সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তার বৈধতা অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস করে ফেলেছে।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই সরকার নির্বাচিত নয়; তাই তাদের শাসনক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো নৈতিক বৈধতা। তিনি বলেন, “যতক্ষণ সেই নৈতিক বৈধতা থাকে, ততক্ষণই অনির্বাচিত সরকারের শাসন করার অধিকার থাকে।” তার মতে, গণমাধ্যমে মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং হামলার পর দৃশ্যমান জবাবদিহির অভাব- এই সব মিলিয়ে সরকারের সেই নৈতিক ভিত্তিই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতা শুধু সাংবাদিকদের নয়

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত দেড় মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি একটি কথাই শুনেছেন, নিরাপত্তাহীনতা। এই নিরাপত্তাহীনতা শুধু সাংবাদিকদের নয়; নারীদের ক্ষেত্রে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ও ভিন্ন মতাবলম্বী ও নির্বাচনে আগ্রহী রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেও সত্য।

তিনি বলেন, এই উদ্বেগের কথা মানুষ বলেছিল সাম্প্রতিক হামলার আগেই, যা ছিল একটি আগাম সতর্ক সঙ্কেত।

জনগণের আস্থার সঙ্কট : সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, দ্বিতীয় বড় সঙ্কট হলো বর্তমান সরকারের ওপর জনগণের আস্থার অভাব। তিনি বলেন, “মানুষ বিশ্বাস করছে না যে সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা দিতে পারবে,” এই আস্থাহীনতার পটভূমিতেই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সর্বস্তরের সংহতি ও মানববন্ধন

প্রতিবাদ সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক সংগঠন, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী সংগঠন, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভা শেষে কাওরান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলের পাশের সড়কে মানববন্ধন করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা একযোগে গণমাধ্যমে হামলার বিচার, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকার দাবি জানান।

বিশ্লেষণ : সাংবাদিক নিরাপত্তা ও সরকারের বৈধতা, একই সূত্রে গাঁথা

বিশ্লেষকদের মতে, মাহফুজ আনাম ও দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের বক্তব্য দু’টি আলাদা বিষয় নয় বরং একই সঙ্কটের দুই দিক।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা, মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেয়া- এই তিনটি বিষয় একসাথে অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক বৈধতাকে দুর্বল করছে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক উত্তরণমুখী সময়ে এই সঙ্কট যদি সমাধান না হয় তাহলে তা শুধু গণমাধ্যম নয়, পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত এই সভা দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সাংবাদিকদের জীবনরক্ষা ও সরকারের নৈতিক বৈধতা একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

মাহফুজ আনামের ভাষায়, এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন। আর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষায়, এটি সরকারের বৈধতা টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন। এই দুই প্রশ্নের জবাব দিতে না পারলে সঙ্কট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।