জ্বালানিতে ভরসা, গ্যাসে বাড়তি বোঝা
Printed Edition
- দেশে আড়াই লাখ মেট্রিকটন তেল মজুদ
- এলপিজির দাম এক লাফে বাড়ল ৩৮৭ টাকা
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশে বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিকটনের বেশি জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। সরকারের দাবি, এ মজুদ দেশের বর্তমান চাহিদা পূরণে যথেষ্ট এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে একই দিনে ভোক্তাপর্যায়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে ব্যয়ের চাপ বাড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জ্বালানি বিভাগের সম্মেলন কে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিভাগের যুগ্মসচিব মুনির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে মোট দুই লাখ ৫৫ হাজার ১৮ মেট্রিকটন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুদ রয়েছে ডিজেল এক লাখ ২২ হাজার ৬৬০ মেট্রিকটন, যা মোট ব্যবহারযোগ্যতার প্রায় ৬৩ শতাংশ। কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতের জন্য ডিজেল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ খাতে সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকার আশাবাদী। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অকটেনের মজুদ ৯ হাজার ২১ মেট্রিকটন, পেট্রোল ১২ হাজার ১৯৪ মেট্রিকটন, জেট ফুয়েল ৪১ হাজার ৮৭৬ মেট্রিকটন, ফার্নেস অয়েল ৫৮ হাজার ৭৩৬ মেট্রিকটন, কেরোসিন ৯ হাজার ৩৭৮ মেট্রিকটন এবং মেরিন ফুয়েল এক হাজার ১৫৩ মেট্রিকটন রয়েছে। যুগ্মসচিব বলেন, “বর্তমান মজুদ দেশের সার্বিক জ্বালানি চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত। কোথাও সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা নেই।’
অন্য দিকে সংসদে একই দিনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রণাবেণ কাজ এবং ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝেমধ্যে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হতে পারে।
লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে সরকার শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় জ্বালানি নিরীা কার্যক্রম জোরদার করেছে। প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ, ঘোড়াশাল ও নারায়ণগঞ্জে ৭৪টি স্থাপনায় এ কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দ জনবল তৈরির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ৪২ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি নিরীক এবং ১৭৮ জন জ্বালানি ব্যবস্থাপক তৈরি করা হয়েছে।
মন্ত্রী আরো জানান, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, টেলিভিশন প্রচার, স্টিকার লাগানো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে এসি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার, ব্যবহার শেষে সুইচ বন্ধ রাখা এবং পিক আওয়ারে ওয়াশিং মেশিন, ওয়েল্ডিং মেশিন, পানির পাম্প, ওভেন ও ইস্ত্রি ব্যবহার না করার বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চলছে।” মসজিদ, বাসাবাড়ি, দোকানপাট এবং সরকারি অফিসেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়মূলক নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
তবে জ্বালানি সরবরাহে স্বস্তির খবরের মধ্যেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ এক ধাক্কায় দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা। একই সাথে অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি।
বিইআরসি জানিয়েছে, সৌদি আরামকোর এপ্রিল মাসের ঘোষিত আন্তর্জাতিক মূল্য এবং ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় এ সমন্বয় করা হয়েছে। কমিশনের হিসাবে, প্রতি মেট্রিক টন এলপিজির গড় আন্তর্জাতিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৮২ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার এবং ডলারের গড় বিনিময় হার ১২২ দশমিক ৯৪ টাকা ধরা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজির খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে ৫.৫ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন সিলিন্ডারের দামও নতুন করে সমন্বয় করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও ডলারের উচ্চ বিনিময় হার সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নার খরচ আরো বেড়ে যাবে। একদিকে সরকার জ্বালানি মজুদ ও বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতার বার্তা দিলেও, অন্য দিকে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে নতুন চাপ তৈরি করেছে। সামনে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা আরো বাড়বে। ফলে উৎপাদন সমতা ধরে রাখা এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।