সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক : অর্থ উপদেষ্টা
হাদির চিকিৎসাব্যয় অর্থ বিভাগের বাজেট থেকে মেটানো হবে
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
কিছু ক্ষেত্রে পুরোপুরি সন্তোষজনক না হলেও দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে দাবি করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত মত নয়, অনেকেই একই কথা বলছেন। তিনি আরো বলেছেন, ওসমান হাদির চিকিৎসাব্যয় অর্থ বিভাগের বাজেট থেকে দেয়া হবে। এখানে টাকা-পয়সা কোনো ব্যাপার না।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে ‘অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি’ এবং ‘সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি’র বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন দাবি করেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়; ক্ষুদ্র বা মাইক্রো পর্যায়ে কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট।
তিনি বলেন, কোনো দেশের অর্থনীতির সব খাত একসাথে ভালো করবে- এমন প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশ্বের কোনো দেশেই এমন নেই, যেখানে সব খাত একযোগে খুব ভালোভাবে চলতে পারে। এটা সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক ও খাতভিত্তিক সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সম্মিলিত কর্মদক্ষতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অর্থনীতি নিজে নিজে চলে না। পুঁজির বড় একটি অংশ নির্ভর করে বিভিন্ন অংশীজন কিভাবে কাজ করছে এবং সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে তদারকি করা হচ্ছে, তার ওপর। আর এসব অংশীজনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। অর্থনীতির সব দিকের ওপর সরকার এককভাবে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। মন্ত্রণালয়ে বসে আমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এটা সম্ভব নয়।
ওসমান হাদি বিদেশে চিকিৎসার ব্যয় অর্থ বিভাগের বাজেট থেকে দেয়া হবে : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বাজেট থেকে অর্থ দেয়া হবে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, হাদির ব্যাপারে বাইরে পাঠাবে বলে যখন আমাদের মেসেজ দিলো আমরা বলেছি টাকা-পয়সার কোনো ব্যাপার নয়, উইল গিভ অ্যালোকেশন। হাদির জন্য কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, হাদিকে যখন বলেছে বাইরে পাঠানো হবে তো অবভিয়াসলি টাকা ইনভলভ, আমরা বলেছি যে যাই লাগে আমরা প্রস্তুত। হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে নিতে হবে। কিন্তু লাকিলি (সৌভাগ্যক্রমে) অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব বাজেট থেকে দিচ্ছে। পরে হয়তো অর্থ আমরা হিসাব করব। তিনি বলেন, বোর্ড যখন বলেছে তখন ইমিডিয়েটলি সরকার অর্থের মতামত চেয়েছে, আমরা বলে দিয়েছি যেকোনো সময় আমরা প্রস্তুত।
এলএনজি, সার ও চাল আমদানিসহ ১০ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন : নতুন পঞ্জিকা বছরের জন্য এলএনজি কার্গো, সার ও চাল আমদানিসহ ১০টি প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে ‘সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি’। এতে মোট ব্যয় হবে এক হাজার ৯৬৭ কোটি ৮৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা। গতকালের ক্রয় কমিটি বৈঠক শেষে জানানো হয়, আসন্ন নতুন বছরের জানুয়ারিতে ব্যবহারের জন্য স্পট মার্কেট থেকে আন্তর্জাতিক কোটেশনের মাধ্যমে এক কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। এটি ২০২৬ সালের জন্য দ্বিতীয় এলএনজি কার্গো আমদানি। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’ এ কার্গোটি সরবরাহ করবে। প্রতি এমএমবিটিইউ ৯.৯৯ ডলার দরে বাংলাদেশী মুদ্রায় এতে ব্যয় হবে ৪২০ কোটি ৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
সৌদি থেকে কেনা হবে ৮০ হাজার মেট্রিক টন সার : বৈঠকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত চুক্তির আওতায় সৌদি আরব-এর ‘সাবিক অ্যাগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি’ থেকে দু’টি লটে (লট নং ১২ ও ১৩) চল্লিশ হাজার মেট্রিক টন করে মোট ৮০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির দু’টি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন ৪১৩.৪৬ ডলার দরে বাংলাদেশী মুদ্রায় এতে ব্যয় হবে ৪০৬ কোটি ১৮ লাখ ৩১ হাজার টাকা। বৈঠকে চলতি অর্থবছরের জন্য আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্যাকেজ-০৮-এর আওতায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল ক্রয়ের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স বাগাদিয়া ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড’ এ চাল সরবরাহ করবে। প্রতি মেট্রিক টন ৩৫১.১১ ডলার দরে বাংলাদেশী মুদ্রায় এতে ব্যয় হবে ২১৪ কোটি ৭০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
নওগাঁ ও বগুড়ায় সারের গুদাম নির্মাণ : বৈঠকে ‘সার সংরক্ষণ ও বিতরণের সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের প্যাকেজ-১-এর আওতায় দু’টি পৃথক লটে নওগাঁয় (লট-৪) একটি সাইটে ২৫ হাজার মেট্রিক টন এবং বগুড়ায় (লট-১) একটি সাইটে ২০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি পৃথক গোডাউন নির্মাণের দু’টি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নওগাঁর গোডাউনটি নির্মাণ করবে নৌবাহিনীর ‘ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড’। এতে ব্যয় হবে ৫৪ কোটি ৭০ লাখ ৫১ হাজার টাকা।
অন্য দিকে বগুড়ার গোডাউনটি নির্মাণ করবে ‘এসএস রহমান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’। এতে ব্যয় হবে ৫৯ কোটি ২৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর’ (এলজিইডি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘হোস্ট অ্যান্ড এফডিএমএন এনহ্যান্সমেন্ট অব লাইভস থ্রোয়াউ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (এইচইএলপি)’ আওতায় একটি প্যাকেজ (হেল্প/ইউএন-১) কাজ সম্পাদনে ঠিকাদার নিয়োগের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ কাজটি করবে ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন’ (আইওএম)-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস।
কুমিল্লা সড়ক জোনের উন্নয়নে ২ প্রস্তাব : অন্যান্যের মধ্যে বৈঠকে ‘সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ’ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন কুমিল্লা সড়ক জোনে চারলেনের একটি আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন এবং কুমিল্লা সড়ক বিভাগের অধীন চারটি জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীত করতে দু’টি পৃথক পূর্তকাজ সম্পাদনে দু’টি পৃথক প্রস্তাবে ঠিকাদার নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘কুমিল্লা-লালমাই-চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর-বেগমগঞ্জ (আর-১৪০) (লক্ষ্মীপুর আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড থেকে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা) এবং বেগমগঞ্জ-সোনাইমুড়ী-রামগঞ্জ (আর-১৪২) (সোনাইমুড়ী-রামগঞ্জ) আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪-লেন সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্যাকেজ নং ডব্লিউপি-০২-এর পূর্তকাজ সম্পাদনে ব্যয় হবে ১৫৬ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে এ কাজটি পেয়েছে যৌথভাবে- ‘এমএএইচ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ ও ‘মেসার্স রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং’।
অন্যদিকে ‘কুমিল্লা সড়ক বিভাগাধীন চারটি জেলা মহাসড়ক যথাযথমান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের প্যকেজ নং ডব্লিউডি-০৩-এর পূর্তকাজ সম্পাদনে ব্যয় হবে ১২৯ কোটি ৪০ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে এ কাজটি পেয়েছে যৌথভাবে- ‘এস-ইউ কনসোর্টিয়াম (‘শামীম এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ ও ‘ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’।
রাবনাবাদ সেতু নির্মাণ : এ ছাড়া বৈঠকে ‘সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ’ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন পটুয়াখালী সড়ক বিভাগের অধীন ‘লেবুখালী-বাউফল-গলাচিপা-আমড়াগাছিয়া জেলা মহাসড়কের (জেড-৮৮০৬) ৭০তম কিলোমিটারে রাবনাবাদ নদীর ওপর ‘রাবনাবাদ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের প্যাকেজ নম্বর ডব্লিউপি-১-এর পূর্তকাজ সম্পাদনে ঠিকাদর নিয়োগের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে এ কাজটি পেয়েছে যৌথভাবে- ‘এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’, ‘মেসার্স জন্মভূমি নির্মাতা ও ‘ওহিদুজ্জামান চৌধুরী’ (এমএনও)। এতে ব্যয় হবে ১৬৪ কোটি চার লাখ ৮২ হাজার টাকা।