পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের নীরবতায় তৈরি হচ্ছে আস্থাহীনতা

নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এখনো পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বছরের পর বছর চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার দেশের পুঁজিবাজারে হঠাৎ আস্থা ও প্রত্যাশার ঝলকানি দিয়ে আবার যেন তা হাওয়ায়ই মিলে গেল। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত পুঁজিবাজার নানামুখী বিতর্কের কারণে দীর্ঘ মন্দার মধ্য দিয়ে পার করে এলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসে তার জানানও দিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এখনো পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এতে নতুন করে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

সাধারণত সারা বিশে^ কোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির প্রথম আভাসটি আসে পুঁজিবাজার থেকে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসেও তেমনই ইঙ্গিত ছিল দেশের পুঁজিবাজারের আগামী দিনের পথ চলার। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সাথে বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন আচরণ করছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে থাকা বিনিয়োগকারীরা পুঁজিাবাজর নিয়ে নতুন সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দেখতে উন্মুখ হয়ে আছেন।

সর্বশেষ ২৩ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজার সূচকের উন্নতি ঘটে। এর আগে টানা চার দিনে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটির অবনতি ঘটে ১৩৫ পয়েন্টের বেশি। গতকাল বুধবার সকালেও লেনদেন শুরু হতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে পুঁজিবাজারগুলো। পরবর্তীতে স্বল্প সময়ের জন্য দুই পুঁজিবাজার সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও দিনের বাকি সময় সূচকের আচরণ ছিল অস্থিরতায় ভরা। তবে লেনদেনের শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। এতে বাজারগুলো সূচকের উন্নতি দিয়েই লেনদেন শেষ করে।

ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১২ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। পাঁচ হাজার ৫৪২ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৫৫৪ দশমিক ৮২ পয়েন্টে। এদিন লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের শিকার হলেও কিছুক্ষণের মধ্যে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে ডিএসই সূচক। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডিএসই সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ১৮ পয়েন্ট। লেনদেনের এ পর্যায়ে নতুন করে বিক্রয়চাপ শুরু হলে নি¤œমুখী হয়ে ওঠে সূচকটি।

দিনের বাকি সময় এ চাপ অব্যাহত থাকে। এ সময় বাজার যেমন গতি হারায় তেমনি সূচকের আচরণও অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু বেলা ১টার পর হঠাৎ বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। এ সময় সূচকটি দিনের সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৫৬৬ পয়েন্টে পৌঁছে যায়। তবে দিনের সমন্বয় শেষে পাঁচ হাজার ৫৫৪ পয়েন্টে স্থির হয় সূচকটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৮ দশমিক ২৭ ও ৪ দশমিক ৭৪ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ২৪ দশমিক ৯০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২০ দশমিক ৯৪ ও ২০ দশমিক ০১ পয়েন্ট।

সূচকের উন্নতি ঘটলেও গতকাল অবনতি ঘটে দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনে। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৫৬৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ২৫৯ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮২৪ কোটি টাকা। অপরদিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ১৯ কোটি টাকা থেকে ১৩ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন। দিনের বেশির ভাগ সময় সূচকের নেতিবাচক প্রবণতাই গতকাল বাজারগুলোতে লেনদেনের অবনতির কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলো ঘুরে বিনিয়োগকারীদের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে তারা নয়া দিগন্তকে জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এখন যত দ্রুত সরকার পুঁজিবাজার বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে ততই বাজারের জন্য ভালো হবে। আর দেরি করলে আবারো বাজারে আস্থাহীনতা বেড়ে যাবে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে চলছে পুঁজিবাজার। এখানে সর্বস্বান্ত হয়েছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। নতুন সরকারের উচিত হবে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার পুঁজিবাজার উপহার দেয়া যেখানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা স্বাচ্ছন্দ্যভাবে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন। আর ব্যাংকনির্ভরতা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজার হয়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সরবরাহের প্রধান উৎস।

আগের দু’দিনের মতো গতকালও ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল সিটি ব্যাংক। ৪২ কোটি ২৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ৩২ লাখ ২১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় ২১ লাখ ১৬ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানটি গতকালও ব্র্যাক ব্যাংকের দখলে ছিল। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্যাংক এশিয়া, রবি অজিয়াটা, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ওরিয়ন ইনফিউশন, কে অ্যান্ড কিউ, ইস্টার্ন ব্যাংক, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট ও বিডি থাই ফুডস।

ডিএসইতে দিনের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল প্রকৌশল খাতের কোম্পানি কে অ্যান্ড কিউ। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল মোজাফ্ফর হোসাইন স্পিনিং মিলস। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে জিকিউ বলপেন, ন্যাশনাল টিউবস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, ব্যাংক এশিয়া, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস, বিবিএস ক্যাবলস, কপারটেক ও বেক্সিমকো ফার্মা।

ডিএসইতে গতকাল দরপতনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স। ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ দরপতনের শিকার মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফার্স্ট ফিন্যান্স, ইবিএল এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, আরএসআরএম স্টিলস, অ্যাপোলো ইস্পাত, নুরানি ডাইং, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।