সাক্ষাৎকার : আয়মান জায়দান

দখলদার শক্তি ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান চায় না

দখলদার শক্তি ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান চায় না

Printed Edition
first-5
দখলদার শক্তি ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান চায় না

নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে আয়মান জায়দানের এই সাক্ষাৎকার নেন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, সাথে ছিলেন তুরস্কের শীর্ষ পত্রিকা ডেইলি সাবাহ-এর সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ জাকির হোসেন

আল কুদস ইন্টারন্যাশনালের (কিউআইআই) ডেপুটি জেনারেল ডিরেক্টর আইমান জায়দান বলেছেন, ইসরাইলি দখলদার শক্তি কখনোই ফিলিস্তিনি সমস্যাকে সমাধানের টেবিলে এনে সমাধান চায় না। ফিলিস্তিনিদের এ ধরনের পরিস্থিতিতে পবিত্র প্রতিরোধের সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘদিনের এবং তা অব্যাহত থাকবে। কোনো পরিস্থিতিতেই আমরা কখনোই আত্মসমর্পণ করব না। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর বিশেষ করে ফিলিস্তিনের চার পাশের দেশগুলোর আরো বেশি ভূমিকা রাখা উচিত। তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

ইস্তাম্বুলে ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ওমানা আল আকসা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সের শেষ পর্যায়ে সাইড লাইনে নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আয়োজক ব্যক্তিত্ব আয়মান জায়দান এ কথা বলেন। ‘উম্মাহর মিম্বর থেকে আল-আকসা মসজিদ পর্যন্ত’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত আন্তর্জাতিক খতিব স্কলার ও দাঈদের তৃতীয় সম্মেলনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয় যখন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি ১৯৩১ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম ইসলামী সম্মেলনের ৯৩তম বার্ষিকী সমাগত। ১৯৩১ সালের এই মাসেই জেরুজালেম ও সমগ্র ফিলিস্তিনের তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতি হাজী আমিন আল-হুসাইনি রহ:-এর ঐতিহাসিক আহ্বানে আল-আকসা প্রাঙ্গণে একত্র হয়েছিলেন মুসলিম বিশ্বের ২২টি দেশের ১৪৫ জন আলেম প্রতিনিধি। তারা আল-আকসা মসজিদে দাঁড়িয়ে পবিত্র ভূমি ও ইসলামী পবিত্র স্থানগুলো রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন। সেই সম্মেলনই প্রথম স্পষ্ট করে দিয়েছিল- আল-আকসার লড়াই কোনো আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটি পুরো উম্মাহর সম্মিলিত দায়িত্ব ও ঐতিহাসিক কর্তব্য। এবারের দুই দিনের সম্মেলনে সেই অঙ্গীকারকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।

নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে আয়মান জায়দানের এই সাক্ষাৎকার নেন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, সাথে ছিলেন তুরস্কের শীর্ষ পত্রিকা ডেইলি সাবাহ-এর সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ জাকির হোসেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

নয়া দিগন্ত : গাজা, পশ্চিম তীর, আল আকসা ইস্যুতে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনীরা। এ সমস্যার সমাধানে ইসরাইল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঠিক কী চাইছে বলে মনে করেন?

আয়মান জায়দান : দখলদার শক্তি আল আকসা মসজিদে ইহুদি ধর্মের আচারগুলো পালন করে, জেরুসালেমের পরিচয় তারা পাল্টে দিতে চায়। এজন্যই ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত ও তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে একের পর এক ভূমি দখলে তেলআবিব আগ্রাসী নীতির বাস্তবায়ন করছে। পরিস্থিতি খুবই অস্বাভাবিক ও বিপজ্জনক, সত্যিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। তারা শুধু আমাদের স্লোগানের ভেতর আবদ্ধ করে রাখতে চায়। ইসরাইলি রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই ফিলিস্তিনি সমস্যাকে সমাধানের টেবিলে আনতে চায় না। ইউরোপীয় দেশগুলো ফিলিস্তিন সমস্যার দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলে। কারণ ওসব দেশের জনমত বা জনগণ সরকারগুলোর ব্যাপারে এ দাবিতে চাপ সৃষ্টি করে আসছে। ফলে ইউরোপের দেশগুলো মুখে বলে তারা ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান চায়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান চায়। কিন্তু সত্যিকার পরিস্থিতি তা বলে না। গাজায় গণহত্যা চলছে, সাগরের দিকে তাকিয়ে দেখুন কোনো সাহায্য আসতে বাধা দেয়া বন্ধ হয়নি এবং গাজার আইডেনটিটি তারা বদলে দিতে চাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : গাজায় যুদ্ধবিরতির পরের পরিস্থিতিটা ঠিক কেমন?

আয়মান জায়দান : গাজায় গণহত্যা এখনো চলেছে,পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে, এরপর খারাপ পরিস্থিতি থেকে ফিলিস্তিনিরা আরো ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা এখন আমাদের ওপর নিরস্ত্র নীতি চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। গাজা তারা তাদের মতো করে পুনর্গঠন করতে চাচ্ছে। নতুন সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাচ্ছে, যাতে তারা তাদের শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। তাই ফিলিস্তিনিদের দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। আমরা কখনোই দখলদার শক্তির শাসনাধীন বা তাদের কার্যত ক্ষমতার বাতাবরণে বন্দী হয়ে থাকতে চাই না। ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগ এজন্যই যে তারা নিজেদের নিজেরাই শাসন করবে। প্রয়োজনে তারা ফের অস্ত্র হাতে তুলে নেবে। ফিলিস্তিনিদের এ ধরনের পবিত্র প্রতিরোধের সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘদিনের এবং তা অব্যাহত থাকবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা কখনোই আত্মসমর্পণ করব না।

নয়া দিগন্ত : নেতানিয়াহুর সরকার গাজায় আসলে ঠিক কী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাইছে?

আয়মান জায়দান : নেতানিয়াহুর গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা হচ্ছে আদৌতে ফিলিস্তিনিদের নির্মূল এবং তাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করা। তারা এভাবেই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে চায়। নেতানিয়াহুর মৌলবাদী সরকারের এটাই কৌশল। কোয়ালিশন সরকার টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহু ইহুদিবাদীদের কাছে এ কৌশল রক্ষায় অঙ্গীকারে আবদ্ধ। নেতানিয়াহু সরকারের উল্লেখযোগ্য ও জরুরি অংশ হচ্ছে উগ্র জায়নবাদীরা। তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার বা বিশ্বাস করে না। তারা তাওরার ইহুদি রাষ্ট্রের অস্তিত্বে বিশ্বাসী বলে তেলআবিবের চেয়ে গাজা আর পশ্চিম তীরকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ কারণেই আমরা ইসরাইলি আগাসী নীতির বহিঃপ্রকাশ ও ভূমি দখল দেখছি। পশ্চিম তীরে অবকাঠামো গড়ে তুলতে দেখছি।

নয়া দিগন্ত : ফিলিস্তিন সঙ্কটের সমাধানে ওআইসি কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে?

আয়মান জায়দান : আমরা চেষ্টা করছি ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি ও অবস্থান বুঝে যাতে ওআইসি কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। কোনো কোনো সময় ওআইসিকে সঠিক ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। দেখেন, কোনো লাশের কাছ থেকে আপনি কি আশা করতে পারেন? দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি। তারপরও তাদের অবস্থান বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তুরস্ক, কাতার, মালয়েশিয়া পাকিস্তানের অবস্থানের আমরা প্রশংসা করি। তবে আমরা মুসলিম ভাইদের কাছ থেকে আরো কার্যকর ভূমিকা চাই। আমরা বুঝি মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তাদের সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি ফিলিস্তিনি ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর বিশেষ করে ফিলিস্তিনের চার পাশের দেশগুলোর আরো বেশি ভূমিকা রাখা উচিত।

নয়া দিগন্ত : ফিলিস্তিনের চলমান ইস্যুতে ফাতাহ ও মাহমুদ আব্বাসের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

আয়মান জায়দান : তারা আসলে ফিলিস্তিনি সঙ্কট বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাইরে অবস্থান করছে। তারা আদৌ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই নাই। রাজনৈতিকভাবে তাদের কোনো ভূমিকা না থাকায় সত্যিকারভাবে তারা কোনো সঙ্কট সমাধানে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তারা এ পরিস্থিতিতে কোনো খেলোয়াড় নয়। আল আকসার কর্মসূচিতে তাদের নিশ্চুপ থাকতে দেখা গেছে। এমনকি ইসরাইলি সরকারের মাধ্যমে স্বতন্ত্র ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ হিসেবে তারা আমাদের টার্গেট পর্যন্ত করেছে। আমাদের অভিন্ন বোঝাপড়া প্রয়োজন ছিল কিন্তু আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনি। ইসরাইলি আগ্রাসন মোকাবেলায় প্রতিবাদ বিক্ষোভে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নিতে হবে। ইসরাইলিরা হামাস, গাজার ফিলিস্তিনি বা অতীতে সেই ১৯৪৮ সাল থেকে আমাদের সবার বিরুদ্ধে হামলা করে আসছে। আসলে আমরা এক ও অভিন্ন। কিন্তু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান বা উদ্যোগ দুর্ভাগ্যবশত বিরক্তিকর। মাহমুদ আব্বাস বা ফাতাহর এই অবস্থানের কারণে ইসরাইলিরা তাদের ব্যবহার করতে পারছে। কিন্তু আমরা শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধভাবে ইসরাইলিদের মোকাবেলা করতে চাই। কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই। এই বাস্তবতাকে কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু এ ব্যাপারে ফাতাহ বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো রাজনৈতিক অবস্থান বা কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

নয়া দিগন্ত : সার্বিক পরিস্থিতি আপনার সংগঠন কিভাবে মোকাবেলা করছে?

আয়মান জায়দান : আল কুদস পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে জেরুসালেম অভিমুখে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি নিয়ে মুসলিম, সুন্নি ও শিয়া, খ্রিষ্টান, অমুসলিমদের, বিশ্বের মুক্তবুদ্ধি ও বিবেক সম্পন্ন মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি আমরা। আমরা বিশ্বাস করি জেরুসালেম শহর সকল সভ্যতা ও ধর্মের মিলনস্থল, জেরুসালেম ইস্যু তাই ঐক্যের প্রতীক। সমঝোতা ও সাধারণ বোঝাপড়ার বিষয়। আমাদের সবাইকে মিলে ঐক্যের প্রবাহ সৃষ্টি করতে হবে। জেরুসালেম ও মসজিদুল আকসা কিংবা ফিলিস্তিনি পতাকার কখনোই অবসান হতে পারে না। তাই আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ অনেক বড় মূল্যবোধ ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়। সবাইকেই এই কর্মসূচির মর্মার্থ উপলব্ধি করা উচিত।

নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে আপনারা কিভাবে দেখছেন?

আয়মান জায়দান : ফিলিস্তিনি হিসেবে আমরা যেমন স্বাধীনতার জন্য লড়ছি, তেমনি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশী ভাইবোনদের বাকস্বাধীনতা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে আমরা খুশি। যখন কোথাও স্বাধীনতা থাকে তখন সেখানে সমৃদ্ধি আসে। সেখানে আপনি আপনার দেশের জন্য স্বাধীনভাবে কৌশল নির্ধারণ করতে পারেন। বাংলাদেশী ভাইবোনদের এই অর্জন আমাদেরও আশা জাগায়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মুসলমানরাও ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখছে। এটা আমাদের শক্তি জোগায়। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তরুণদের সম্পূর্ণ সক্ষমতা ও দক্ষতা রয়েছে, তারা সুশিক্ষিত, যে কারণে ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি তারা মুসলিম উম্মার কল্যাণে অনেক অবদান রাখাতে পারে। আলকুদস সংগ্রামের জন্য তারা দূত হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে।