তানোরে শিশু সাজিদের শেষ বিদায়ে হাজারো মানুষের ঢল

Printed Edition

রাজশাহী ব্যুরো ও তানোর সংবাদদাতা

অশ্রুসিক্ত নয়নে শিশু সাজিদের শেষ বিদায়ে হাজারো মানুষের ঢল নামে। গত বৃহস্পতিবার রাতে তাকে উদ্ধার ও মৃত ঘোষণার পূর্বাপর সময় থেকেই রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট পূর্বপাড়া যেন শোকে স্তব্ধ। বেদনায় ভারী হয়ে ওঠা গ্রামের বাতাসে বারবার ভেসে আসছিল মসজিদের মাইকের ঘোষণা- রাকিবুল ইসলামের দুই বছরেরর শিশু সাজিদ আর নেই। শিশু সাজিদের হৃদয় বিদারক এ ঘটনা হাজারো মানুষের চোখ নিজের অজান্তেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় এলাকার নেককিড়ি কবরস্থানের সামনের মাঠে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নেককিড়ি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

নামাজে জানাজা শুরুর অনেক আগে থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা, বিভিন্ন বয়েসী নারী-পুরুষ ও শিশুরা গ্রামের রাস্তা ধরে সাজিদের বাড়ির দিকে যেতে থাকেন। তারা একবার দেখতে চান সেই নিষ্পাপ মুখটা, যে মুখে প্রতিদিন ছিল হাসি, আর আজ সেখানে নিস্তব্ধতা। বৃদ্ধ থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া ছেলেদের সবার চোখ ভেজা।

কেউ কেউ বলতে থাকেন আল্লাহ এমন মৃত্যু যেন আর কারো না হয়। সাজিদের ছোট্ট দেহটি যখন সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় আনা হলো, তখন কান্নার রোল পড়ে গেল চারপাশে। তার মা রুনা খাতুন বারবার ছুটে আসতে চাইছিল- বারবার করছিল আহাজারি। লোকজন ধরে রেখেছিল তাকে; কিন্তু কান্না থামাতে পারেনি কেউ।

নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা মিজানুর রহমান। এ সময় তিনিসহ অনেকেই বক্তব্য দেন। তারা অবহেলাজনিত এ ধরনের মৃত্যু যেন আর না হয়, সে জন্য সবাইকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন।

এরপর ইমাম সাহেব নামাজে জানাজা শেষে যখন তাকবির দিলেন, মানুষ হাত তুলল দোয়ার ভঙ্গিতে। হাজারো কণ্ঠে দোয়া অনুষ্ঠিত হলো।

সবাই সাজিদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন। একই সাথে তার পরিবারকে আল্লাহ ধৈর্য ধরার তৌফিক দান করেন এমন দোয়াও সবাই করেন।

নামাজে জানাজা শেষে সাজিদের ছোট্ট কফিনটা যখন কবরের দিকে নেয়া হলো, তখন বাতাস যেন থেমে গেল, শুধু শোনা যাচ্ছিল কান্নার শব্দ। কান্না করছেন স্বজনরা। একটি শিশুর নামাজে জানাজা-যেখানে অংশ নিয়েছে পুরো গ্রাম, এমন দৃশ্য কেউ কখনো দেখেনি গ্রামবাসী।

গত বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার পাচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে সাজিদ গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে নিখোঁজ হয়। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ৫০ ফুট মাটি খনন করে ৩২ ঘণ্টা পর শিশু সাজিদকে উদ্ধার করে।

এতে একে একে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট। সাথে ছিল পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষ। এরপর তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

এদিকে শিশুটির দাফন শেষে সাংবাদিকরা কথা বলার চেষ্টা করেন সাজিদের বাবা রাকিব উদ্দীনের সাথে। এ সময় তিনি বলেন, ‘যাদের অবহেলার কারণে আমার দুই বছরের অবুঝ ছেলের এই অবস্থা আমি তাদের বিচার চাই।’

এর আগে জানাজায় রাকিবুল ইসলাম ছেলের জন্য দোয়া চান। তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধরে সবাই দোয়া করেছেন। আবারো দোয়া চাই।’

জানাজার আগে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অন্যের অবহেলার জন্য ছেলের মৃত্যু হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই।’

সাজিদের মা রুনা জানিয়েছেন, তার তিন ছেলে। এর মধ্যে দুই বছরের সাজিদ মেজ। তাদের একটি ট্রলি মাটিতে দেবে গেলে ছোট ছেলে সাদমানকে কোলে নিয়ে আর সাজিদের হাত ধরে তিনি ঘটনাস্থলে আসেন। ফেরার সময় অসাবধানতাবশত সাজিদ ওই গর্তে পড়ে যায়।

রুনা বলেন, ‘আমি সামনে হাঁটছিলাম, আর সাজিদ পেছনে। একটু পর পেছনে ঘুরে দেখি, সাজিদ আর নাই। শুধু মা মা ডাক শুনতে পাচ্ছি।’