স্বাধীনতা কার, কিভাবে ; ড. মাহবুব হাসান

শব্দ-স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও তার সাথে ওতপ্রোত। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে প্রথমেই চিন্তার স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। আমরা কোনো বিষয়ে চিন্তা করতে গেলেই যদি অন্যের ধ্যান-ধারণা এসে সহযোগ দেয়, তাহলে বুঝতে হবে আমার চিন্তা করার স্ব

Printed Edition

শব্দ কী?

হঠাৎই এমন বিকট শব্দ পেলাম যে, তার উৎস খুঁজতে মন চাইল। সেই শব্দের উৎস খোঁজার আগেই মনের ভেতরে অবিরত শুনলাম... স্বাধীনতা, স্বাধীনতা।

কেন স্বাধীনতা শব্দটি বাজছে? আমি কি স্বাধীন নই? কোনটা বড়... ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নাকি সামষ্টিক স্বাধীনতা?

ব্যক্তির চেয়ে দেশ বড়, ... বলেছি আমরা। আমরা বিশ্বাস করি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সেটাও আমরা বিশ্বাসের অংশ করেছি। কেন ব্যক্তি রেখে সমষ্টিকে বড় করে তুলেছি? যেখানে ব্যক্তিই সমষ্টির উৎস? ব্যক্তির স্বাধীনতা না থাকলে সমষ্টির স্বাধীনতা কী... তা আমরা বুঝতে পারি না। কখন পারব? কবে সেই বোধের উন্মেষ ঘটবে?

সমষ্টির বল কত বড় হলে তার শক্তি জনসুনামিতে পরিণত হতে পারে তা তো চোখের সামনে, মনের ভেতরে নতুন অধ্যায় হিসেবে আমরা দেখেছি ২০২৪-এর ৫ আগস্ট, ৩৬ জুলাই। তারও আগে ১৯৯০-এ এরশাদ স্বৈরাচারের পতনের আগে জনসুনামি দেখেছি। স্বৈরাচারের পতনের পর আমরা বুঝেছিলাম সমষ্টির শক্তি, তার ঐক্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ কী হতে পারে, কী হয়। এরও আগে ১৯৬৯-এ একবার গণ-আন্দোলনের পর গণসুনামি কি হয়েছিল, আইয়ুবশাহীর গদি উল্টে দিয়েছিল। সেই পাকিস্তানি শাসনামলে আমাদের আকাক্সক্ষা ব্যক্তি থেকে সমষ্টির স্বাধীনতার রূপকল্প সৃষ্টি করেছিল।

এ-ভাবেই তো ব্যক্তির স্বাধীনতার রূপচেতনা সমষ্টির আকাক্সক্ষায় রূপ লাভ করেছে। আমরা যুদ্ধ করেছি খালি হাতে, প্রতিবাদী শব্দের তুফানে উড়িয়ে, ডামি রাইফেলে ট্রেনিং নিয়ে, তৈরি হয়েছিলাম সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের জন্য। সেই সুযোগটা তো এসেছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে, ... যখন পাকিস্তানি সামরিক সরকার হামলা চালিয়ে দমন করতে চেয়েছিল আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীন চেতনাকে, রক্তাক্ত করে দিয়ে জনপদের ভেতরে যে ব্যক্তির স্বাধীনতা অঙ্কুরিত হয়েছিল তা নির্মমভাবে হত্যা করে। সমষ্টিকে রক্তাক্ত করেও দমন যে করা যায় না, ইতিহাস তার সাক্ষী। ব্যক্তির স্বাধীনতাই যে সমষ্টির স্বাধীনতার উৎস, ... সেটা জানা গিয়েছিল। আসলে ব্যক্তির স্বাধীনতাই প্রধান শব্দ। একজন কৃষাণ যুবক বুঝেছিল যে, উৎপাদনের হাতিয়ার রেখে তাকে এখন লড়াই করতে হবে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্ত্র নিয়ে, তখন সে ধানের ক্ষেত থেকে চলে গিয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামের ট্রেনিংয়ে। সে জোয়াল জুড়তে পারে, গরু চালাতে পারে, লাঙলের টুঁটি ধরে চাষ ধরতে পারে, ওই ট্রেনিং তার কর্মের স্বাধীনতাকে পোক্ত করেছিল। আর যুদ্ধের ময়দানে সে যে ট্রেনিং নিলো তা তাকে স্বাধীনতার জন্য অস্ত্রের ও শৃঙ্খলার ট্রেনিংয়ে তাকে একজন স্বাধীন সত্তায় পরিণত করেছিল। এর পেছনেই ছিল স্বাধীনতা শব্দটি রক্তস্রোতের মতো বহমান।

আজ আমরা অনেকেই বুঝি সীমান্ত দিয়ে দেশের স্বাধীন চিহ্ন সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু স্বাধীনতার মৌলিক শক্তি তো ব্যক্তির অন্তরে বইছে। সেই স্বাধীনতার নাম গণতন্ত্র।

গণবিস্ফোরণ হয়েছিল ওই ব্যক্তির স্বাধীনতার জন্য। তার নাম কথা বলার স্বাধীনতা। ব্যক্তি কথা বলতে না পারলে, সেই স্বাধীনতার জন্য প্রতিবাদ প্রতিরোধ করে শাসকের টুঁটি চেপে ধরে ক্ষমতার মসনদ থেকে নামিয়ে আনে মাটিতে। হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ও পলায়ন সেই ইতিহাস সৃষ্টি করে আমাদের দেখিয়ে গেল যে, ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বাধীনতাবোধ যখন একটি জায়গায় সৃষ্টি হয় তখন তা জনসুনামিতে পরিণত হতে সময় লাগে না। ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই তার রাজনৈতিক ইতিহাসের রাজসাক্ষী।

২.

মানুষের স্বাধীনতার বিশ্বাস যখন স্থায়ী সম্পদে পরিণত হয়, তখন তার অধিকার কায়েম করার একটি রাজনৈতিক নেশা বিশ্বাসে রূপ লাভ করে। ৩৬-শে জুলাইয়ে যে জনসুনামি হয়েছে তার শক্তি ব্যক্তির চেতনার সম্মিলিত রূপ ছিল অচিহ্নিত। মানুষ বিশ্বাস করেনি যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন ওই হাসিনা পতন ও পলায়নে কেবল তারাই যুক্ত হয়েছিল। আবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের আহ্বানে মহানগর ঢাকা ও সন্নিহিত জেলার ছাত্র-জনতারা আসেনি, তারা হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬ বছরের অন্যায় ও অবৈধ শাসনের শেকড় উৎখাতে এসেছিল। এটা বুঝতে পেরেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা ৩৩/৩৪/৩৫ জুলাইয়ের ঠিক আগে আগে। কিন্তু তাদের হাত থেকে সেই বোঝার দড়িটার মাথা হাতফসকে গিয়েছিল জনতার হাতে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মন্ত্র তাদের জানা নেই বা ছিল না। ঠিক এই কারণেই একটি জনসুনামিকে তারা প্রশাসনের গর্তে ঢুকিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যে তারাই ঢুকে পড়ে। এই বুদ্ধি সেইসব লোকের যারা চেয়েছিল জনআকাক্সক্ষাকে প্রশাসনের লোভের শেকলে বাঁধতে পারলেই এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়। আসিফ নজরুলকে সেই কুবুদ্ধিদাতার প্রকাশ্য ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। জনবিস্ফোরণের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে না থাকায় ধাবমান জনস্রোত ঠেকে গিয়ে হাসিনার আবাসস্থল গণভবনের দিকে। হাসিনার পলায়নের পর সেই জনতাণ্ডব তছনছ করে দেয় ওই ভবনটি। এখন ওই গণভবন পরিণত হয়েছে একটি জাদুঘরে। ইতিহাস রক্ষার জন্য জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

৩.

ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রকাশ্য রূপকল্প হচ্ছে গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের চেহারা আমরা তেমনভাবে বুঝি না। আমরা কেবল ভোট দেয়ার অধিকারকেই বুঝি। এটি একটি পথ নিজের স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য। অন্যগুলোর মধ্যে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। আইনের সুশাসন, মতপ্রকাশের জন্য সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার সার্বিক স্বাধীনতা। সংবিধানের যে কয়টি বিষয়কে মৌলিক স্বাধীনতা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, সবই ব্যক্তির স্বাধীনতা পাওয়ার রাজনৈতিক ঘোষণা। এই মৌলিক বা মূল স্বাধীনতার বিষয়টি যখনই অর্জিত হবে, তখনই আমরা বলতে পারব...এ-দেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

এগুলো হচ্ছে গণতন্ত্রের কাঠামোগত বিষয়। এর প্রয়োগিক বিষয় অনেক কঠিন। যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে গ্রাম ও নগরের প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সমান হতে হবে। এই ভাবনাকে যদি সত্য দিয়ে বিচার করি, দেখব, সেখানে সত্য নেই। সব প্রতিষ্ঠানের সত্য হচ্ছে বৈষম্য। ঢাকার স্কুলের শিক্ষকরা অনেক দামি ও সুশিক্ষিত মানুষ। গ্রামের একটি স্কুলের শিক্ষক অতটা সুশিক্ষিত নন। ফলে যে শিক্ষার মান এক করা হবে... বলা হলেও, তা একই মানের হয় না। এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানে। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে মান এক করা। কিন্তু আমরা দেখেছি, অনেক ভালো শিক্ষক গ্রামে বা মফস্বলের জেলা স্কুলেও যেতে চান না। এতে করে জেলা স্তরের শিক্ষার্থীরাও বিভাগীয় ও ঢাকার স্কুলের সাথে এক মানের রেজাল্ট করতে পারে না। ফলে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে জেলা, উপজেলা ও গ্রামবাংলার স্কুলগুলো। আইসরা হাইস্কুলটিকে যদি ঢাকার নামকরা স্কুলের মানে উঠানো না যায়, তাহলে শিক্ষায় বৈষম্য থেকে যাবে। আর যদি একই মানে উন্নীত করা যায়, তাহলে সুনামি শিক্ষককে সেখানে বদলি করে পাঠাতে হবে। কিংবা আইসরা হাইস্কুলের শিক্ষকদের বিশেষ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তাদের মান উন্নত করা যায়, তাহলে কিন্তু এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।

একটি প্রকল্প ধারণা দেয়া যেতে পারে।

৬৪ জেলাল ৬৪ উচ্চবিদ্যালয়কে যদি বিশেষ ট্রেনিংয়ে আনা যায় তাহলে ওই সময়ে কারা পাঠ দান করবেন? তাহলে ওই ৬৪ স্কুলে আরেক সেট করে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদেরই ট্রেনিংয়ে পাঠানো যায়। ওই ৬৪টি স্কুলের ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ পর্যায়ক্রমে স্কুলের শিক্ষকদের ট্রেনিং দেবেন। এতে ৬৪টি জেলার ৬৪টি স্কুলের শিক্ষকগণ নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী প্রশিক্ষণের কাজটি সুসম্পন্ন করতে পারেন, তাহলে গ্রামের স্কুলগুলোর মান উন্নত হতে পারে।

তবে সরকার সেটা চায় কিনা তার ওপর এটা নির্ভর করছে। সরকার যদি চায় দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকতে হবে, তাহলে তাই হবে অধিকার বাস্তবায়নের মৌলিক কাজ। সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর জন্মগত অধিকার হচ্ছে শিক্ষা পাওয়ার অধিকার। আমাদের ৮৫ হাজার গ্রামের অনেকটিতেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। সবার আগে বাংলাদেশ বললে সবার আগে প্রতিটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকতে হবে। এ-কাজে হাত দিলে হাজার হাজার কোটি টাকা লাগবে। আবার অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দেশের শিল্পপতিদের অনুরোধ করতে পারেন যে, তারা দালানাদি উঠিয়ে দেবেন। টেবিল, চেয়ার ও বেঞ্চ নির্মাণ করে দেবেন। বিনিময়ে তারা ট্যাক্স রিবেট পাবেন। আমরা তো জানি শিল্পপতিরা কী পরিমাণ ট্যাক্স ফাঁকি দেন। এই কাজের অংশীদার করে নিয়ে সেই ফাঁকি দেয়া টাকাও তোলা যাবে।

প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতাল ও বড় বড় ক্লিনিককে বলতে হবে, তারা নিজ জেলার প্রতিটি প্রাইমারি বিদ্যালয়ের লাগোয়া ক্লিনিক অবকাঠামো গড়ে সেখানে চিকিৎসা ও ডাক্তার নার্স নিয়োগ দিয়ে পরিপূর্ণতা দান করবে। প্রতিটি বালক-বালিকা যাতে প্রতি মাসেই স্বাস্থ্যসেবা পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক কাজে শিক্ষিত ও অর্থবান মানুষদের অংশীজন করে নেয়া গেলে তৃণমূলের শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে।

এ-দু’টি বিষয় সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার কায়েমের। ওষুধ শিল্পের পতিদের দিয়ে ওই সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লিনিকে ওষুধপত্র ও চিকিৎসকদের দিয়ে পরিচালনা করা যায়, তাহলে তাদের সেবার বিষয়টি বিশেষ মূল্য পাবে। সামাজিকভাবে স্বীকৃতিদান যেকোনো শিল্পপতিকে আকৃষ্ট করবে বলে আমার বিশ্বাস।

এ-হচ্ছে কাঠামোগত উন্নয়নের কথা। কিন্তু তা বাস্তবায়ন অত সহজ নয়। পরিকল্পনা যখন কল্পনা-স্তরে থাকে,তখন বেশ ভালো মনে হয়। তার বাস্তবায়নই আসল কাজ। সঠিক পরিকল্পনা অনেক সময় তা বাস্তবায়নকে সহজ ও গতিশীল করতে পারে, যদি দক্ষ জনবল নিয়োগ ও তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়।

শব্দ কী এবং তার উৎস খুঁজতে গিয়ে আমি যেখানে পৌঁছলাম, সেই স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতগুলো মানব শরীরের কাঠামোর মতো একে-অন্যের সাথে জড়িত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, এদের মধ্যে কোনোরকম যোগাযোগ নেই, আসলে যুক্তি এবং সেই সংযুক্তি সংস্কৃতির মতোই জোরালো।

শব্দ-স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও তার সাথে ওতপ্রোত। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে প্রথমেই চিন্তার স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। আমরা কোনো বিষয়ে চিন্তা করতে গেলেই যদি অন্যের ধ্যান-ধারণা এসে সহযোগ দেয়, তাহলে বুঝতে হবে আমার চিন্তা করার স্বাধীনতা খর্বিত হচ্ছে। নিজের ভূমি থেকে উৎসারিত চিন্তাকে নিজের ভূমিজ ভাষায় ত নির্মাণ করা জরুরি। আর নিজের ভূমিজ ভাষা লুকিয়ে থাকে লোকাল ডায়লেক্টে। স্থানীয় ভাষাই মূল শক্তি। যে শব্দ নিজের প্রাণাবেগ থেকে বেরিয়ে আসে, সেটাই তার নিজস্ব ভাষা। সেখানেই আছে শাব্দিক স্বাধীনতা। আর সেই স্বাধীনতাই আমি খুঁজছি।