উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা
রাজধানীতে বৃষ্টি জনমনে স্বস্তি কেটে গেছে তাপদাহ
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অতিবৃষ্টির কথা জানিয়ে আবহাওয়া অধিদফতর বলছে এতে করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিচু এলাকাগুলোতে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, দেশের উত্তরাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। এর প্রভাবে এখন থেকে পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে ময়মনসিংহ ও সিলেট মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলেও তিনি জানান।
এ দিকে আবহাওয়া নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান জানান, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টি বলয় ‘ঝুমুল’ ধেয়ে আসছে। ৭ মে পর্যন্ত এই শক্তিশালী বৃষ্টি বলয় কার্যকর থাকতে পারে বলে তিনি জানান। এই সময় দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকায় বজ্রবৃষ্টি, কালবৈশাখী ঝড় এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা গেছে এবং সকালে কিছু এলাকায় বৃষ্টিও হয়েছে। বৃষ্টিপাত আরো সক্রিয় হতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে একটি অনুকূল আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে, যা আগামী প্রায় ৭ মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ের মধ্যে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ আবহাওয়াবিদ জানান, উজানের এলাকাগুলো, যেমন মেঘালয়, আসাম এবং চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সময়কালে এসব এলাকায় প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা রয়েছে, যা বাংলাদেশের সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিচু এলাকাগুলোতে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে এই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।
তিনি জানান, প্রথমদিকে বৃষ্টিপাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২৮ বা ২৯ এপ্রিল থেকে এটি ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ২৯ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত সময়ে দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকায় নিয়মিত ঝড়-বৃষ্টির প্রবণতা থাকতে পারে। যদিও মাঝে মধ্যে এক-দুই দিনের জন্য বিরতি দেখা যেতে পারে, তবুও এই সময়ে বৃষ্টিপাতের আধিক্য থাকার সম্ভাবনা বেশি।
ঝড়ের বিষয়ে তিনি বলেন, এই সময়ে অধিকাংশ এলাকায় দমকা হাওয়া বা ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকতে পারে। কিছু কিছু স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে এর চেয়ে কম বা বেশি গতিবেগও হতে পারে। এই বৃষ্টিপাতের কারণে হাওর অঞ্চলে চলমান ধান কাটার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টানা বৃষ্টি হলে কৃষকরা সময়মতো ধান কাটতে পারবেন না, ফলে ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি জানান। আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রার আধিক্য ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২৮ বা ২৯ এপ্রিল থেকে আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক হয়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৪৫ থেকে ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে গুজব ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে মশিউর রহমান বলেন, বাস্তবে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির কারণে তাপমাত্রা কমে আসার সম্ভাবনাই বেশি।
রাজধানীতে বৃষ্টি জনমনে স্বস্তি, কেটে গেছে তাপদাহ
নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, অনেক দিন পর বৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীতে জনমনে ফিরে এসেছে স্বস্তি। আপাতত কেটে গেছে তাপদাহের তীব্র দহন। গতকাল রোববার বিকেলে বৃষ্টির সাথে ছিল কিছুটা ঝড়োহাওয়া। আকাশে ছিল ঘন কালো ও ভারী মেঘ। মেঘ এত কালো ছিল যে পড়ন্ত বিকেলে প্রাকৃতিক আলো কমে গিয়ে রাতের আঁধারের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় গাছের পাতায় জমে থাকা ধূলিবালু পরিষ্কার হয়ে উজ্জ্বল সবুজ আকার ফেরত এসেছে রাজধানীর গাছগুলোতে। আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুসারে মতিঝিল, পল্টন, মালিবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ২০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানীতে হঠাৎ হওয়া বৃষ্টি জনজীবনে স্বস্তি নিয়ে আসার পাশাপাশি কিছু বিড়ম্বনারও সৃষ্টি করে। কোথাও কোথাও ঝড়োহাওয়ার কারণে সাময়িক ভোগান্তিরও সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীতে বৃষ্টি হলেই যানজটের সৃষ্টি হয়ে যায়, গতকালও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ফলে অফিস ফেরত মানুষের প্রচণ্ড ভোগান্তি হয়েছে। যারা পায়ে হেঁটে গন্তব্যে ফেরেন তাদের বাস অথবা রিকশায় উঠতে হয়েছে, দেখা দিয়েছে যানবাহনের অভাব।
গত কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছিল। এতে অনেকের মধ্যে নানা রোগও দেখা দেয়। সর্দি-কাশি ও জ্বর ছাড়াও অনেকেই হিটস্ট্রোকে ভুগেছেন। ছুটতে হয়েছে ডাক্তার ও হাসপাতালে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। গতকালের বৃষ্টি সেই তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে এনেছে। স্বস্তির বৃষ্টিতে মানুষ শুকরিয়া আদায় করে ফেলেছেন মাগরিবের নামাজে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুসারে গতকাল বিকেল ৬টা পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সিলেট এলাকাতেও প্রচুর বৃষ্টি হয়ে গেছে।
আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, এই সময়ের বৃষ্টি বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জন্য উপকারী হবে। তবে অতিরিক্ত ঝড় হলে ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে। তাই কৃষকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এবং স্থানীয়ভাবে সৃষ্ট মেঘমালার কারণে এই বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।