দুই মাসের ইনকাম দিয়ে সারা বছর চলেন শাটলাররা
Printed Edition
জসিম উদ্দিন রানা
‘ক্রিকেটে ব্যাট বল একবার কিনলেই অনেকদিন চলেন, একটা ফুটবল দিয়ে মাসের পর মাস খেলা যায়, একটা স্টিক আর বল দিয়ে অনেকদিন খেলা যায় হকি, একটা টেবিল টেনিস বল দিয়ে খেলা যায় বহুদিন। অথচ ব্যাডমিন্টনে ৩০০-৫০০ টাকা মূল্যের একটা শাটল দিয়ে একটা গেমই খেলা যায় না। কৃপণতা দেখালেও একটা গেমে কমপক্ষে চারটা শাটল লাগে। একটা র্যাকেটের স্টিং ছিড়ে মেরামতে ৫০০-৭০০ টাকা ব্যয় হয়। তাহলে আপনিই বলুন ব্যয়বহুল খেলা কোনটা।’ এভাবেই কথাগুলো বললেন এবারের ইউনেক্স-সানরাইজ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল সিরিজে দেশকে স্বর্ণপদক এনে দেয়া শাটলার জুটি গৌরব সিংহ ও আবদুল জহির তানভীর।
সিলেটের শিবগঞ্জের মনিপুরী পাড়ার বাসিন্দা গৌরব আর বিশ্বনাথ থানাধীন তুকের কান্দি গ্রাম অলঙ্কার ইউনিয়নে বাস করেন তানভীর। দু’জনের বাড়ির দূরত্ব ২০ কিলোমিটার হলেও ব্যাডমিন্টনের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। প্রাকটিস ও খেলা দু’জনের হৃদয়কে করেছে একীভূত। তানভীর তো শুধু অনুশীলনের জন্য কয়েকজন মিলে ফ্ল্যাটবাসা ভাড়া নিয়ে মেস করে থেকেছেন মাসের পর মাস। দু’জনেরই ব্যাডমিন্টন শুরু বাড়ির কাছে খেলা দেখে। গৌরব দিলেন মজার তথ্য, ‘আমাদের বাড়ির পাশে বড় টুর্নামেন্ট হতো। তখন দেখতাম শাটলারদের জার্সির পেছনে বাংলাদেশ লিখা। সেই ২০১০ সাল থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছি বড় হলে আমার জার্সির পেছনেও নাম থাকবে, বাংলাদেশ লিখা থাকবে। আল্লাহ আমার মনে আশা পূরণ করেছেন।
নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে গৌরব জানালেন, ‘আমার প্রাথমিক গুরু প্রদীপ স্যার ও চন্দ্রশেখর। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো ফেডারেশনের অধীনে ১০ দিন ক্যাম্প করি। ২০১৫ সালে অনূধর্ব-১৫তে চাচাতো ভাই মঙ্গল বমকে (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) নিয়ে প্রথম ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন আপ হই। ২০১৯ ও ২০২০ সালে এককে সামার চ্যাম্পিয়ন হই। ওই বছরই ফেনীতে এককে জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। ২০২২ সালে তানভীরের সাথে জুটি হয়। ২০২৩ সালে তাকে নিয়ে ডাবলসে শিরোপা জয়।’
ব্যাডমিন্টনে ভবিষ্যতের আশা না দেখে আমেরিকা ইউরোপে পাড়ি জমান সিলেটের খালেদ, মঙ্গল, সোহেল, জয়নাল, দুলাল, সালমানসহ অনেকে। তাতে কিছুটা মানসিকভাবে আহত হন গৌরব। তার কথায়, ‘তাদের দেখে খেলা শিখতাম, একসাথে খেলতাম, অনেক কিছু শেখার ছিল। গাইডবঞ্চিত হয়ে গেছিলাম। অনেক মিস করেছি তাদের।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২০০১ সালে নেপালে সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল টুর্নামন্টে মঙ্গলকে নিয়ে ডাবলসে ব্রোঞ্জ পেয়েছিলেন গৌরব। একই বছর ইউনেক্স-সানরাইজ সিরিজে জুনিয়রে ডাবলসে চট্টগ্রামের সিবগাতউল্লাকে জুটি করে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। দেড় বছর ধরে খেলছেন আনসারের হয়ে। ইনকাম বলতে আনসার থেকে পাওয়া বেতন। বাবা অসুস্থ থাকায় গৌরবকেই টানতে হচ্ছে সংসারের ঘানি। তার কথায়, ‘একজনের এক মাসের অনুশীলনে মাসে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচা হয়। বছরে খরচ কমপক্ষে তিন লাখ টাকা। কোনো পরিবারের সাধ্য আছে এটা ম্যানেজ করার। আমাদের যা ইনকামতো খেপ খেলেই। বছরে মাত্র দু’টি মাসই শাটলারদের উপার্জনের ক্ষেত্র। এই দুই মাসে ৩৫-৪০টা খেপ খেলে যা অর্জন করি তা দিয়ে ৮ থেকে ৯ মাস চলা যায়। বছরের শেষ দুই তিন মাস অনেক কষ্ট করে চলতে হয়।’
সবচেয়ে মূল্যবান কথাটা বললেন শেষে, ‘একটা বিষয় আপনাকে এনশিওর করতে পারি, খেপ খেলার কারণে কখনোই দেশপ্রেম কমে যায় না। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে যখন কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট হয়, জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হয়- তখন সবকিছু বাদ দিয়ে দেশের খেলায় মনোযোগী হই। প্রাণপণ চেষ্টা থাকে দেশের জন্য কিছু করার, লাল-সবুজের পতাকা উঁচু করে ধরার। তখন খেপের টাকাগুলো নগণ্য মনে হয়।’
বাবার মৃত্যুশোক নিয়েই খেলেছেন তানভীর
গত ৯ নভেম্বর বাবাকে হারিয়েছেন তানভীর। সে শোক নিয়েই নেমেছেন কোর্টে। গৌরবকে নিয়ে হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। তার কথায়, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। দুঃখের বিষয়, বাবা আমার এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। অথচ শাটলার হওয়ার পেছনে বাবার অনেক উৎসাহ ছিল।’
ক্রিকেটার থেকে ব্যাডমিন্টনে ফেরা নিয়ে তানভীর জানান, ‘ক্রিকেটটা ভালোই খেলতাম। এদিক-ওদিক সুনামটাও ছিল। মাঝে মধ্যে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। বড় ভাই আবদুল বাছিরকে অনেকেই বললেন ‘ও ভালো খেলে, কোনো একটা অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দাও। তখন সিলেট রিকাবি বাজার জেলা স্টেডিয়ামে ভাইয়া ভর্তি করে দেন। মঞ্জুর আল মামুন আমার প্রথম কোচ। এরপর আবুল মাল আবদুল মুহিত ইনডোরে সাবেক চ্যাম্পিয়ন এনাম ভাইয়ের অধীনে ছিলাম। বাসা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে কয়েকজন থাকি এবং অনুশীলন করি।’
ভবিষ্যত নিয়ে গৌরব-তানভীর জুটি জানান, ‘খরচটা কমানো গেলে আরো বহু প্রতিভা আলোর মুখ দেখত। স্পন্সর বড় একটা ফ্যাক্টর। কোনো শাটলারের পক্ষে এককভাবে বহুদূর যাওয়া সম্ভব নয়। তার পরও বর্তমানে ফেডারেশনের সেক্রেটারি রাসেল কবির সুমন যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ১০ লাখ টাকার প্রাইজমানি ছিল। যা ছিল অকল্পনীয়। এককে চ্যাম্পিয়ন পেয়েছে দেড় লাখ টাকা ও রানার আপ পেয়েছে এক লাখ টাকা। তা ছাড়া বিদেশের ব্যাপারেও যথেষ্ট হেল্প করছেন, যা আগে ছিল না। এখন যদি ফেডারেশন যোগাযোগ করে শাটলারদের জন্য কিছু স্পন্সর জোগাড় করতে পারে, তাহলে হবে সোনায় সোহাগা।’