আগামী বছরের শুরুতে গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • সহায়তা আটকে রাখায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব
  • ইসরাইল ও তার মিত্রদের গাজা পুনর্গঠনের খরচ বহন করতে হবে : জাতিসঙ্ঘ

আগামী জানুয়ারি মাস থেকেই জাতিসঙ্ঘ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) গাজায় মোতায়েন শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা। ডেইলি সাবাহ বরাতে তারা রয়টার্সকে জানান, এই বাহিনী হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। বিভিন্ন দেশ এতে অংশ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং বাহিনীর আকার, গঠন, আবাসন, প্রশিক্ষণ ও কার্যবিধি নিয়ে আলোচনা চলছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, বাহিনীর নেতৃত্বে একজন মার্কিন দুই তারকা জেনারেলকে বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই বাহিনী মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ। প্রথম ধাপে ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। হামাস বন্ধীদের মুক্তি দিয়েছে এবং ইসরাইল আটক ফিলিস্তিনিদের ছেড়ে দিয়েছে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘শান্তি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের জন্য নীরবে প্রস্তুতি চলছে। আমরা স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে চাই।’

এ দিকে ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, তারা গাজায় স্বাস্থ্য ও নির্মাণ কাজে সহায়তার জন্য ২০ হাজার সেনা পাঠাতে প্রস্তুত। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রিকো সিরাইত বলেন, ‘এখনো পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর্যায়ে আছি। বাহিনীর কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।’ বর্তমানে ইসরাইল গাজার ৫৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাকি হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাস করছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাহিনী প্রথমে ইসরাইল-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মোতায়েন হবে। এর পর আইএসএফ স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করলে ধাপে ধাপে ইসরাইলি সেনারা সরে যাবে। ১৭ নভেম্বর জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব পাস করে, যাতে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন এবং আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দেয়া হয়। ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী বছর শুরুর দিকে বোর্ড অব পিসে কোন কোন বিশ্বনেতারা থাকবেন তা ঘোষণা করা হবে।

নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা : জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক বাহিনীকে নবগঠিত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সাথে কাজ করার অনুমোদন দিয়েছে। তাদের দায়িত্ব হবে গাজাকে নিরস্ত্র করা- অর্থাৎ সামরিক ও ‘সন্ত্রাসী’ অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং অস্ত্র স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করা। তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ বাহিনীকে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে। তবে প্রতিটি দেশের সাথে এ বিষয়ে আলাদা আলোচনা চলছে।

হামাস জানিয়েছে, নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি তাদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হয়নি। তাদের অবস্থান হলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা অস্ত্র ছাড়বে না। তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির জন্য অস্ত্র ব্যবহারে বিরতি দেয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, দ্বিতীয় ধাপে নিরস্ত্রীকরণ ও অস্ত্র ছাড়ার দিকে অগ্রসর হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মার্কিন বন্ধুদের বহুজাতিক বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা আছে। আমি তাদের বলেছি, স্বাগত। তবে কিছু কাজ তারা করতে পারবে, কিছু কাজ তাদের সামর্থ্যরে বাইরে।’

সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব : জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ গত শুক্রবার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, যেখানে ইসরাইলকে গাজায় পূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিতে, জাতিসঙ্ঘের স্থাপনার অখণ্ডতা রক্ষা করতে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সাম্প্রতিক পরামর্শমূলক মতামতের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আনা হয়েছে, যেখানে ইসরাইলকে দখলদার শক্তি ও জাতিসঙ্ঘ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। নরওয়ে ও আরো ১২টির বেশি দেশ প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। এতে ১৩৯ দেশ সমর্থন দেয়, ১২ দেশ বিরোধিতা করে এবং ১৯ দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। ভোটের আগে নরওয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি মেরেতে ফিয়েল ব্রাটেস্টেড বলেন, ‘২০২৪ ছিল গত তিন দশকের মধ্যে অন্যতম সহিংস বছর। ২০২৫-ও একই ধারা অনুসরণ করছে। আগামী বছরে পরিস্থিতি সহজ হবে- এমন কোনো লক্ষণ নেই। দখলকৃত ফিলিস্তিন বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।’

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা প্রদানের মৌলিক বিষয়গুলোতে স্পষ্টতা চেয়েছিল। ব্রাটেস্টেড জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যও উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি ইসরাইলের অনুমতি ছাড়া জাতিসঙ্ঘের শেইখ জাররাহ কম্পাউন্ডে প্রবেশকে নিন্দা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটি জাতিসঙ্ঘের স্থাপনার অখণ্ডতা রক্ষার দায়িত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’

পুনর্গঠনের খরচ ইসরাইলের : জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ বলেছেন, গাজা পুনর্গঠনের খরচ ইসরাইলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ইতালিসহ প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোকেও বহন করতে হবে। লন্ডনে আয়োজিত এক মানবাধিকার বিষয়ক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, গাজায় যে গণহত্যা চলছে, তার দায় শুধু ইসরাইলের নয় যেসব দেশ এই গণহত্যায় সহায়তা করছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।

আলবানিজ বলেন, ‘রাষ্ট্রগুলোকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। অবৈধ দখলদারিত্ব বজায় রাখা একটি রাষ্ট্রকে সহায়তা করা বন্ধ করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, যুক্তরাজ্যের ভূমিকা নিয়েও শক্তিশালী তদন্ত হওয়া উচিত, বিশেষ করে সাইপ্রাসের ঘাঁটি ব্যবহার করে যে সহায়তা দেয়া হয়েছে তা নিয়ে। তার ভাষায়, ‘ইসরাইল যদি উপনিবেশবাদী শক্তি হিসেবে অভিযুক্ত হতে না চায়, তবে তাকে উপনিবেশবাদী আচরণ বন্ধ করতে হবে- ভূমি দখল, মানুষকে উচ্ছেদ করা- এসব বন্ধ করতে হবে।’ আলবানিজ বলেন, গাজায় দুই বছরের গণহত্যা আসলে ‘৬০ বছরের দায়মুক্তির ফল’ এবং এটি থামবে না ‘যতক্ষণ না লন্ডন, রোম, বার্লিন বা প্যারিসে নীতিগত পরিবর্তন আসে।’

আলবানিজ জানান, যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় তিনি এখন অপরাধীর মতো আচরণের শিকার হচ্ছেন তার মতোই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক ও ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একই আচরণের মুখোমুখি। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে পারেন না, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে রিপোর্ট পেশ করতে পারেন না, এমনকি ব্যাংক অ্যাকাউন্টও খুলতে পারেন না।

জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন আলবানিজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির অনুমোদন দেয়ায় চারজন আইসিসি কর্মকর্তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়।

ফিলিস্তিনি যুবক নিহত : উত্তর গাজার জাবালিয়ায় গতকাল শনিবার সকালে ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি যুবক নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে। ওয়াফা সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ১৯ বছর বয়সী মুহাম্মদ সাবরি আল-আধাম জাবালিয়া আল-নাজলা এলাকায় ইসরাইলি গুলিতে নিহত হন।

ইসরাইলি বাহিনী গাজা সিটির পূর্বাঞ্চল আলুতুফাহ এলাকায় এবং রাফাহর উত্তরে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়ার অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। আল-আধাম নিহত হওয়ার পর গত ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮৫ জনে। আহত হয়েছেন এক হাজার সাতজন। এ সময়ের মধ্যে ৬২৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।