বিক্ষোভ সমাবেশে এনসিপির নেতারা

আওয়ামী লীগের বিচার করতেই হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
1st-5
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নাহিদ ইসলাম : নয়া দিগন্ত

গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের বিচার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটসংলগ্ন সড়কে দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার আয়োজনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, আরিফুল ইসলাম আদীব, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা: তাসনিম জারা, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

পূর্ব ঘোষিত এ কর্মসূচিতে অংশ নিতে বিকেল ৩টার আগে থেকেই বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে জড়ো হতে থাকে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভারসহ ঢাকার বিভিন্ন থানা ও আশপাশের এলাকা থেকে ছোট-বড় মিছিল নিয়ে আসেন তারা। মিছিলগুলোতে নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের বিচার ও নিষিদ্ধের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। সমাবেশের সামনের দিকে জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের অবস্থান নিয়ে বসতে দেখা যায়। সমাবেশ চলার একপর্যায়ে আসরের আজান হলে মঞ্চেই নামাজে দাঁড়ান দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের অন্যতম দাবি এবং জাতির কাছে আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বিগত ১৬ বছরের যে ফ্যাসিজম, অত্যাচার তৈরি হয়েছিল তার বিচার নিশ্চিত করা। বিচার এবং সংস্কারের জন্যই মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। বাংলাদেশের জনগণ এই প্রথমবার ২৪-এ রাজপথে নেমে আসেনি, রক্ত দেয়নি, আত্মত্যাগ করেনি। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের জনগণ রাজপথে নেমেছে, রক্ত দিয়েছে, শাহাদতবরণ করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ২০২৪ এ রাজপথে নেমে এসেছিল ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে। বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ কিভাবে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে কিভাবে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছে, সেই গল্প আমরা সবাই জানি। তিনটি নির্বাচনকে কুক্ষিগত করে মানুষের ভোটাধিকারকে তারা হরণ করেছিল। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক অংশকে তারা নিশ্চিহ্ন করেছিল এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং আলেম ওলামাদের মতপ্রকাশের অধিকারকে হরণ করেছিল। এ ছাড়াও ধারাবাহিকভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, মোদিবিরোধী আন্দোলনে তারা হত্যাকাণ্ড এবং দমন-পীড়ন চালিয়েছে। সর্বশেষ জুলাই আগস্ট মাসে যখন ছাত্র-জনতা তাদের অধিকারের জন্য রাজপথে নেমে আসে তখন জনতার ওপরে তারা এ দেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবিকে দিয়ে গুলি চালিয়েছিল। আওয়ামী লীগ আর কোনো রাজনৈতিক দল নয়। আওয়ামী লীগ একটি ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার আর কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। এ জন্য আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল করে তার রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম বিচার চলা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করতে হবে।

দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ওপর বারবার গণহত্যা চাপিয়ে দিয়েছে, সে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই বাংলাদেশে রাজনীতি করবার অধিকার রাখে না। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বলতে চাই, অতীতের মতো সুশীল তত্ত্বাবধায়ক সরকার আপনারা না। আপনারা গণ-অভ্যুত্থানের সরকার। গণ-অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট নিয়ে যারা উপদেষ্টা হয়েছেন তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে গণহত্যা করেছে সে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? ৫ আগস্টেই বাংলাদেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আওয়ামী লীগ নামে, নৌকা মার্কা নামে, মুজিববাদী আদর্শের নামে বাংলাদেশে কোনো রাজনীতি চলতে পারে না। অথচ এখনো আওয়ামী লীগের নিবন্ধন আছে। আমরা হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে সন্ত্রাস করেছে সেই আওয়ামী লীগের নাম নির্বাচনের নিবন্ধনের খাতা থেকে কেটে সন্ত্রাসীদের খাতায় উঠাতে হবে। বাংলাদেশে যত দিন পর্যন্ত জুলাই প্রজন্ম বেঁচে আছে তত দিন পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে এক মিনিটের জন্য রাজনীতি করতে দেবো না।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দোসর জাতীয় পার্টি, যারা ৯০-এ স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেছিল তারাও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা করছে। তাদেরকে হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, শুধু আওয়ামী লীগ নয়, তাদের প্রত্যেকটা দোসর যারাই তাদেরকে ন্যূনতম জায়গা দেয়ার চেষ্টা করবে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা দুর্গ গড়ে তুলবে। এনসিপি শুরুর সময় থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের দীপ্ত কণ্ঠস্বর উঁচু রেখেছে। দীর্ঘ সময় ধরে যারা বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এই দায় শুধু এনসিপির নয়। এই দায় বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রত্যেকটা পক্ষের। আমরা প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের কাছে আহ্বান জানাবো, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সকলে মিলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

ড. ইউনুসকে উদ্দেশ্য করে মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আপনি এই আহত এবং শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা আপনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছি। আমরা আপনার কাছে কোনো অনুরোধ বা দাবি করছি না। আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছি। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে। কোন যদি কিন্তুর রচনা নেই, গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করতে হবে।

যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ৫ আগস্টের আট মাস পর আজকে আবারো আমাদের আওয়ামী লীগের প্রশ্নে কথা বলতে হচ্ছে এটাই আমাদের জন্য লজ্জার। আমরা চেয়েছিলাম ৫ আগস্টের পর খুনি হাসিনা থেকে শুরু করে ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে রাজনৈতিকভাবে এবং নিবন্ধন বাতিল হবে। কিন্তু আমরা দেখছি সরকার এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম হাতে নেয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগ প্রশ্নে নানা ধরনের আপসকামী কথাবার্তা বলতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডার নামধারী ব্যক্তিবর্গ নানাভাবে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। আমরা ছাত্র-জনতা বলতে চাই, কোনভাবে আওয়ামী লীগের প্রশ্নে কেউ যদি দুর্বলতা পোষণ করে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে, তাহলে ছাত্র-জনতা আবার ৫ আগস্টের মতো এক দফায় চলে যাবে।

সমাবেশ উপলক্ষে গত কয়েক দিন ধরেই রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করেছে দলটি। এতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। লিফলেটে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলের সাতটি অপরাধের কথা উল্লেখ করে দলটি। এগুলো হলো-২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহ দমনের নামে ৫৭ সেনা কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড; গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহরণ; ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার হরণ; ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চালানো হত্যাযজ্ঞ; লাখ লাখ কোটি টাকার দুর্নীতি, লুটপাট ও পাচার; ২০২১ সালে নরেন্দ্র মোদিবিরোধী আন্দোলনে চালানো হত্যাকাণ্ড এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চালানো নজিরবিহীন গণহত্যা।