বুশরার বিল্লু
Printed Edition
মিয়া ইব্রাহিম
একদিন কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে আমার ছোট মেয়ে কারো কাছ থেকে একটি আধ মরা লিকলিকে বিড়াল ছানা বাসায় নিয়ে এলো। সেটা দেখে তাকে একটু গালমন্দ করলাম। গালমন্দ করার একটি কারণও ছিল। তা হলো এর আগেও আর একটি বিড়াল ছানা আমার ছেলে বাসায় এনেছিল খুব সখ করে। সেটা এমন হয়েছিল যে, কয়েক মাসের মধ্যে তার ব্যবহার দিয়ে সে বাসার সবার মন জয় করে নিলো। আমি তাকে পছন্দ না করলেও ঘুমিয়ে গেলে চুপ করে আমার শরীর ঘেঁষে শুয়ে থাকত। যখন খুব গরম অনুভব করতাম তখন চেয়ে দেখতাম বিড়াল আমাকে ঘেঁষে খাটের মধ্যে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। এভাবে সে আমার হৃদয়ও কেড়ে নিয়েছিল। অফিস ছুটির দিন যখন বাজারে যেতাম সে আকারে ইঙ্গিতে তার ভাষায় তার জন্য মাছ বা মুরগি আনতে বলত। এটা বুঝতে পারতাম যখন বাজার থেকে ফিরে বাজারের ব্যাগ কিচেনে রাখতাম। সে সাথে সাথে কিচেনে গিয়ে ব্যাগ নাড়াচাড়া করে দেখত তার জন্য খাবার আনা হয়েছে কি না। বাজারের ব্যাগ যখন আমার স্ত্রী খুলত সে তখন ম্যাঁও ম্যাঁও করে আনন্দ প্রকাশ করত। যতক্ষণ না তাকে মাছ সিদ্ধ করে খেতে না দেয়া হতো ততক্ষণ সে কিচেনে লেজ তুলে ঠাকুরের মতো বসে থাকত। এভাবে যখন তার প্রতি খুব মায়া জমে গেল, তখনই একদিন সে হঠাৎ করে উধাও। তাকে আর কোথাও খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় একসপ্তাহ ভরে বাসার আশপাশে এলাকাজুড়ে সেটাকে খুঁজেছি । কিন্তু কোথাও তাকে আর পাওয়া গেল না। এলাকার বাসার অলিগলি দিয়েও খোঁজা হলো। এমন কি রাস্তার নাইট গার্ডদের দিয়েও খোঁজা হয়েছে। এই প্রথম একটা বিড়ালের জন্য আমি মনে খুব আঘাত পেয়েছিলাম তাকে হারিয়ে। সে কারণেই এই বিল্লুকে যখন আমার মেয়ে বাসায় নিয়ে আসে, তখন একটু রাগ করেছিলাম। বলছিলাম, দেখবা এ বিল্লুও কিছুদিন পর মায়া জমিয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যাবে।
প্রকৃতিগত কারণেই সব বিড়ালের ধর্ম (সব পোষা প্রাণীকুল) লালনকারীর প্রতি একই রকম কৃতজ্ঞতাবোধ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। অনেক সময় মানুষের কাছ থেকেও তা আমি দেখিনি। কিছুদিন এই লিকলিকে রুগ্ন বিড়ালটাকে যতœ নেবার পর আগের বিড়ালের মতোই দেখতে খুব সুন্দর চেহারা হলো। আচরণও আগের বিড়ালকে ছাড়িয়ে গেল। ধীরে ধীরে এই বিড়ালটি আগেরটার চেয়েও আমার এবং বাসার সবার মনে একটা বড় জায়গা করে নিলো। আমি যখন অফিস থেকে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতাম ক্লান্ত হয়ে, তখন আমাকে দেখলেই তার ভাষায় আমাকে স্বাগত জানাত। দৌড়ে এসে আমার পায়ে লুটিয়ে পড়ত। তার একটা কারণ ছিল । আমার স্ত্রী এবং ছেলে মেয়েরা ওকে বলত বিল্লু, তুই আব্বুকে ঠিকমতো আদর করবি, না হলে কিন্তু তোর এ বাসায় থাকা মুশকিল হয়ে যাবে।
তোর কোনো খাবার আসবে না আব্বুকে আয়ত্তে করতে না পারলে। মানুষের মতো কথা বলতে না পারলেও আমাদের কথাগুলো বোধহয় পোষা বিড়ালটি মনের গভীর থেকে খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিল। আস্তে আস্তে সে আমাদের সবার প্রাণপ্রিয় হয়ে গেল। কয়েক মাস পর সে গর্ভবতী হয়ে পড়লে তখন তার প্রতি সবাই একটু বেশি যতœশীল হলাম। আমরা বাসার তিনতলায় থাকি। পাশের বাসায়ও একটা বিড়াল ছিল। পাশাপাশি বাসা হওয়াতে আমার বাসার বারান্দা থেকে অন্য বাসার বিড়ালের সাথে তারা অনেক সময় ভাব বিনিময় করত। প্রায় সময়ই গর্ভবতী অবস্থায় বিল্লু আমার বাসার জানালার কার্নিশে গিয়ে ঘুমাত। আমরা কেউ তাকে বিরক্ত করতাম না। সে মনে করত এটা যেন তার নিজের বাড়ি নিরাপদ আশ্রয়। সে স্বাধীনভাবে যেখানে খুশি সেখানে যেত।
তার খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারেও একটি রুটিন ছিল। সময় মতো তাকে খাবার না দিলে ম্যাঁও ম্যাঁও করে চিৎকার শুরু করে দিত।
বুঝাত এটা যেন ওর বাড়িঘর ওকে কেন এখনো খাবার দেয়া হচ্ছে না। বাসার সবাই তার ব্যাপারে বেশ যতœশীল ছিল। কয়েকবার তাকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়েছে। একবার ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। বসুন্ধরা পশু হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তার তাকে এন্টিবায়েটিক, স্যালাইন এবং ইনজেকশন লিখে দিলেন। আমি নিজে ওকে স্যালাইন ও ইনজেকশন পুশ করতাম। এভাবে সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল। তার মাস খানিকের মধ্যে একদিন এই বিল্লুকেও হঠাৎ আর বাসায় পাওয়া যাচ্ছে না। তার খাবারের সময় অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে, তার খাবার রেডি করে বাসার সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করল। একসময় আমার ছেলে বাসার নিচে গিয়ে বিল্লুকে দেখতে পায় সে শব্দ করে কান্না করছে। তার শরীর রক্তাক্ত। তার শরীরের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বুঝা গেল সে আমার বাসা থেকে পাশের বাসায় তার সঙ্গীর সাথে দেখা করার জন্য লাফ দিয়ে নিচে পড়ে গেছে। তিনতলা থেকে নিচে পড়ে গিয়ে তার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। একে তো গর্ভবতী তার ওপর এ অবস্থা। তাড়াতাড়ি তাকে আবার বসুন্ধরা হাসপাতালে নেয়া হলো। ডাক্তার এক্সরে, আলট্রাসনো করলেন এবং রিপোর্ট দেখলন। রিপোর্টে দেখা গেল তার পেটে চারটি বাচ্চা আছে এবং সেগুলো আর জীবিত নেই। তার পিছনের অংশ অর্থাৎ মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। বাঁচলেও সে আর জীবনে হাঁটতে পারবে না।
এই মুহূর্তে তার সিজার না করা হলে বিল্লুকেও বাঁচানো যাবে না এটা ডাক্তারের পরামর্শ। অন্তত বিল্লুকে বাঁচানোর প্রয়াসে সিজার করে মৃত চারটি বাচ্চ বের করা হলো। বিল্লুর অবস্থা একজন সিরাজিয়ান মায়ের অবস্থার চেয়েও ভয়াবহ। কারণ, বিল্লুর পেছনের অংশ ভেঙে গেছে সবসময় রক্ত ঝরতে থাকত। এভাবে তার চিকিৎসা চলতে থাকল প্রায় ছয় মাস। বাসার সবাই গলদ ঘর্ম হয়ে তার সেবা সুশ্রƒষা করে কিছুটা সুস্থ করে তোলা হলো। বিল্লুর পিছনে প্রায় হাজার পঁচিশ টাকা খরচ হলো। বিল্লু আর সোজা হয়ে হাঁটতে পারেনি। তবু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে তার ভালোবাসার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে। ২-৩ দিন ধরে হঠাৎ বিল্লুর শরীরটা বেশ খারাপ মনে হচ্ছিল। খাবার খাচ্ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত হলো তাকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হবে।
ও যেন আমার সন্তানের মতোই ছিল। ২০ সেপ্টেম্বর সকালেও তার সাথে আমার কথা হয়েছে। আমার ছোট মেয়ে বুশরা ওকে যতœ করে গোসল করিয়েছে। মুরগির গোশত খাবার দেয়া হয়েছে খায়নি। আমি জোহরের নামাজ পড়ে তাকে দেখলাম সে ঘুমাচ্ছে। আসরের সময় আমার মেয়ে তাকে পানি খাইয়েছে। আমি মাগরিব নামাজ পড়ে একটু বাইরে হাঁটতে বেরিয়েছি তখনই আমার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল রিসিভ করতেই আমার স্ত্রীর কান্নার আওয়াজ শুনলাম। তার কথা বুঝতে পারছিলাম না। পরক্ষণে জানালো বিল্লু আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। নিজেকে খুব কষ্টে সংবরণ করে তাৎক্ষণিক বাসায় এলাম। বাসার সবাই কান্না করে চোখের জলে ভাসিয়েছে। কখন যে আমার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে গেছে টের পাইনি। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে কবরস্থ করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত মহেষ ছোট গল্পের একটি লাইন শুধু আজকে খুব বেশি করে মনে পড়ছে , গফুর মহেষের মৃতদেহ সামনে নিয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছিল, ‘অভিমান করে চলে গেলি মা?’
বিল্লু তুই আমাদের ভুলগুলো ক্ষমা করিস।