কিশোরগঞ্জে ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্টের আশঙ্কা
বিএডিসির ব্রি-৮৮ ধান চাষে দিশেহারা কৃষক
Printed Edition
আল আমিন কিশোরগঞ্জ
কয়েক দিন পরেই কিশোরগঞ্জের হাওরে শুরু হবে বোরো ধান কাটা। হাওরজুড়ে এখন সেই প্রস্তুতিই চলছে। তবে যারা বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) থেকে বিজে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কয়েক শ’ কৃষক। একই ক্ষেতে নানা জাতের ধান দেখা যাচ্ছে। কোনোটা পেকে গেছে, কোনোটা আধাপাকা, আবার কোনোটিতে শীষই বের হয়নি। একই গুচ্ছে হরেক রকমের ধান। এ অবস্থায় কিভাবে ধান কাটবেন ভেবে কুল পাচ্ছেন না কৃষক।
জানা যায়, জেলার করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও বাজিতপুরের হাওরে এমন অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে। বেশি দেখা দিয়েছে করিমগঞ্জ ও ইটনা উপজেলায়। বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি ধান-৮৮ বীজে ভিন্ন জাতের মিশ্রণ থাকায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বীজে মিশ্রণ থাকায় সব ধান একসাথে পাকছে না। ফলে সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারা নিয়ে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। গতকাল শুক্রবার করিমগঞ্জের বড় হাওরে সরেজমিন গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
গুণধর ইউনিয়নের মদন গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান (৫০) বলেন, ১৩ কানি (৩৫ শতাংশে কানি) জমিত বিএডিসির ৮৮ ধান করছি। ধানতো শুরুতে চেনা যায় না। অহন আমার ক্ষেতে অর্ধেকেও ৮৮ ধান নাই। বাকি ধানগুলো চার-পাঁচ জাতের হইছে। কুনুডা পাইক্যা গেছে, কুনুডার হগলে দুধ আইছে। কুনুডার শীষ অহনও কাঁচা। অহন আমি ধান ক্যামনে কাটবাম। কোনডা কাডবাম। পাকনাডা কাটলে কঁঁঁাঁচাডা কাডন যাইতো না। ধারকর্জ কইরা চাষ করছি। কমপক্ষে ৪০০ মণ ধান অইলোঅইলে। অহন ১০০ মণ ফাইয়াম কি-না সন্দেহ। অহন আমার এ ক্ষতিপূরণ কেলা দিবো। সেখানে কথা হয় খয়রত গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিকের (৪০) সাথে। তিনি বলেন, ১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন। এটি কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী ক্ষেত। সিড ভিলেজ প্রদর্শনী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্টের (ফ্রিপ) আওতায় তাকে এ প্রদর্শনী ক্ষেত করতে দেয়। বীজধান সরবরাহ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। এখানেও একই অবস্থা। এ ক্ষেতে বিভিন্ন জাতের ধান হয়েছে। অর্ধেক ধানও তিনি বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন না বলে জানান।
শুধু হাবিবুর, ওমর সিদ্দিক, আক্তার মিয়া ও জমির উদ্দিন নয়, হাওরে যারা এবার বিএডিসি থেকে বীজ এনে ব্রি ধান-৮৮ চাষ করেছেন, তাদের সবার জমিতে একই অবস্থা। জেলার হাওর উপজেলাগুলোর মাঠ পর্যায়ের অন্তত ২০ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিনিধিকে ধারণা দেন, দশ হাজার হেক্টর পরিমাণ জমিতে এরকম অবস্থা হয়েছে। মোটকথা এবার যারাই বিএডিসির ব্রি-ধান ৮৮ এর- বীজের চারা রোপণ করেছেন তাদের ক্ষেতের অবস্থা কমবেশি একই। তাদের কেউই ঘরে তুলতে পারবে না ফসল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, জেলায় বোরো ধান চাষ হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে। করিমগঞ্জে বড়হাওরসহ বেশ কিছু হাওরে এবং হাওর উপজেলা ইটনাসহ কয়েকটি উপজেলায় এ সমস্যা দেখা গেছে। কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বললেন, সমস্যাটি শুনে কৃষি কর্মকর্তাদের সেখানে পাঠিয়েছিলাম। তারাও ব্রি-ধান ৮৮-এর বীজে মিশ্রণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। এতে ব্যক্তি পর্যায়ে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিএডিসি বলছে, বোরো চাষের জন্য মৌসুমের শুরুতে এবার প্রায় ৩৭০ টন ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ সরবরাহ করেছে তারা। পরে আরো ৩১৮ টন বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন উৎস থেকে তাদের কাছে বীজ আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিক কোথায় সমস্যাটি হয়েছে, কোথা থেকে এ বীজ এলো-তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ বিএডিসির উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি কোথা থেকে এমন বীজ কৃষকদের হাতে গেল। কোনো ডিলার যদি কৃষকদের বিএডিসির প্যাকেটে নকল বীজ দিয়ে থাকে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। আর বিএডিসি যেসব জায়গা থেকে বীজ সংগ্রহ করে সেখান থেকে এমন সমস্যা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেব।
কিশোরগঞ্জ বিএডিসি উপপরিচালক (বীজ উৎপাদন) হারুনুর রশীদ বলেন, ন্যাচারাল মিউটেশনের কারণে একই ফসলের মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, বেশি বয়সের চারা রোপণ কিংবা বীজের উৎসে ত্রুটি থাকলেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।