লোডশেডিং-জ্বালানি সঙ্কটে বন্ধ হতে চলেছে তাঁতশিল্প

উৎপাদন ব্যয় চারগুণ

Printed Edition

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা

অব্যাহত লোডশেডিং ও জ্বালানি সঙ্কটে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম বন্ধ থাকায় ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে মালিকদের। এতে কাপড় উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেছে প্রায় চারগুণ। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে জেলার অধিকাংশ তাঁতকল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সরেজমিন চৌহালী উপজেলার এনায়েতপুর থানার খামারগ্রামে লাভলু-বাবলু কম্পোজিট টেক্সটাইল কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পাওয়ারলুম মেশিনগুলো বন্ধ পড়ে আছে। কাজ না থাকায় শ্রমিকরা কেউ লুডু খেলছেন, কেউ মোবাইলে সময় কাটাচ্ছেন, আবার কেউ অলস বসে আছেন। দীর্ঘ দিনের তাঁত ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন লাভলু জানান, আগে একটি জামদানি শাড়ি তৈরিতে পাওয়ারলুমে বিদ্যুৎ খরচ হতো মাত্র ৪০ টাকা। এখন ডিজেলচালিত জেনারেটরে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি শাড়িতে জ্বালানি ব্যয় চারগুণ বেড়েছে। এর সাথে অতিরিক্ত দাম দিয়েও পর্যাপ্ত ডিজেল মিলছে না।

তাঁত শ্রমিক জুলমাত বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারছি না। অধিকাংশ সময় মেশিন বন্ধ থাকে। আয় না থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, দেনা করে চলতে হচ্ছে।’ শ্রমিক শহিদুল, জামাল ও সোলায়মানও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানান।

কারখানা মালিকরা বলছেন, জ্বালানি সঙ্কট, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও বাজারের অস্থিরতায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে অনেকে পেশা বদল করছেন, কেউ ব্যাংকঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

শিল্প-সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সিরাজগঞ্জ একসময় তাঁত শিল্পের ব্র্যান্ড জেলা হিসেবে পরিচিত ছিল। বেলকুচি, এনায়েতপুরসহ জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন। পাওয়ারলুম ও হ্যান্ডলুম মিলিয়ে জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ তাঁত ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং নীতিগত সমস্যায় ইতোমধ্যে বহু তাঁতকল বন্ধ হয়ে গেছে।

জাতীয় তাঁতি সমিতির সভাপতি আব্দুস ছামাদ খান বলেন, বড় কারখানাগুলো কোনোভাবে চড়া দামে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালালেও প্রান্তিক তাঁতিরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। পাঁচ থেকে ১০টি তাঁত নিয়ে যারা কাজ করতেন, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে তাঁতকল বন্ধ করে দিচ্ছেন। দ্রুত সঙ্কট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।