চট্টগ্রামে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও বায়োডিজেল প্রকল্পের উদ্যোগ

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

  • বাস্তবায়িত হলে ল্যান্ডফিলে বর্জ্যরে পরিমাণ ৭০ থেকে ৯০ ভাগ কমবে
  • ইতোমধ্যে একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে

নগর বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও বায়োডিজেল উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এ লক্ষ্যে একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে।

চট্টগ্রামে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে অতীতে বিভিন্ন মেয়র উদ্যোগ নেয়ার ঘোষণা দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। তবে বর্তমান মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, নগর বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নে তিনি আশাবাদী। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ল্যান্ডফিলের ওপর চাপও কমবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত তাপ উৎপাদন জরুরি। এ ক্ষেত্রে ক্যালোরিফিক ভ্যালু এক হাজার কিলোক্যালরির নিচে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের দেশের নগর বর্জ্যে আর্দ্রতা বেশি থাকায় পর্যাপ্ত তাপ উৎপাদন চ্যালেঞ্জের। তাছাড়া বর্জ্য পোড়ানোর ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক নির্গমনের আশঙ্কাও থাকে, যা পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তবে সমীক্ষা সংশ্লিষ্টদের দাবি, উন্নত কারিগরি নকশা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যেহেতু জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় সরাসরি এ প্রকল্পে সহায়তা করছে, তাই পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বর্জ্য থেকে সাধারণত বায়োগ্যাস, কম্পোস্ট সার, পুনঃপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, বায়োডিজেল ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। সব বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব না হওয়ায় চসিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বায়োগ্যাস ও বায়োডিজেল উৎপাদনের সম্ভাবনাও যাচাই করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আড়াই বছর সময় লাগবে এবং চুক্তির মেয়াদ হবে ২৫ বছর। প্রায় ১২ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিনিয়োগকারীর উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ধারিত দামে কিনে নেবে পিডিবি। সমীক্ষায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ২০ সেন্ট প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে দর-কষাকষির সুযোগ রয়েছে।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, জাপানের জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং ‘চট্টগ্রাম শহরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প’-এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্ল্যান্টের দৈনিক প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা হবে এক হাজার টন বর্জ্য এবং বছরে ৩৩০ দিন পরিচালনার ভিত্তিতে প্রকল্পটি ২৫ বছর চলবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা হবে ১৫ দশমিক ১ মেগাওয়াট (গ্রস) এবং ১২ দশমিক ৬ মেগাওয়াট (নেট), যা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ২০ সেন্ট। মূলধনী ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সঞ্চালন লাইনসহ ১২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। বার্ষিক পরিচালন ব্যয় হবে ১০ মিলিয়ন ডলার এবং বছরে গড়ে ৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার পরিচালন মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের হালনাগাদ সমীক্ষায় জি-টু-জি সহযোগিতা মডেলের আওতায় জাপানের জয়েন্ট ক্রেডিটিং মেকানিজম (জেসিএম) সহায়তায় ভর্তুকি পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের ল্যান্ডফিলে যাওয়ার বর্জ্যরে পরিমাণ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এতে ল্যান্ডফিলের আয়ু বাড়বে এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে।

সমীক্ষায় তিনটি ব্যবসায়িক মডেল বিশ্লেষণ করা হয়েছে- জি-টু-জি সহযোগিতা মডেল, প্রাইভেট সেক্টর বেনিফিট মডেল ও লিমিটেড সাপোর্ট মডেল। প্রথম দু’টি মডেলে ১১ শতাংশের বেশি অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার অর্জন সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমীক্ষা পরিচালনাকারী জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ঢাকাস্থ কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভাস্কর সাহা নয়া দিগন্তকে বলেন, সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় সমীক্ষা হওয়ায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। সরকারি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে আড়াই বছর সময় লাগবে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রকল্পটি টেকসই ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হতে হবে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন আপাতদৃষ্টিতে ব্যয়বহুল হলেও এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্য দিকে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা- দুই সুবিধাই পাওয়া যায়। তাই সামগ্রিক কষ্ট ইফেক্টিভনেস বিবেচনা করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি অগ্রাধিকার পেলেও দেশে বড় পরিসরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ এখনো সীমিত। চীনে এ ধরনের বহু প্ল্যান্ট বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হলেও বাংলাদেশে গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। তবে উপজাত নির্গমন নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত পদ্ধতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চসিক মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে আধুনিক ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। বর্জ্যকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে চায় সিটি করপোরেশন। জাপানের সহায়তায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা বাস্তবায়নে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পাশাপাশি একটি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান বায়োগ্যাস এবং যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠান বায়োডিজেল উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতোমধ্যে সম্পন্ন সমীক্ষাগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তিনি জানান, জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো প্রস্তুতি ও নীতিগত সমন্বয় দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে।

মেয়র আরো বলেন, বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও আর্থিক কাঠামো নিশ্চিত হবে। এটি চট্টগ্রামকে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্ট-টু-এনার্জি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তিনি বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়; এটি টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার অংশ। এতে পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে উঠবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায়ও অবদান রাখা সম্ভব হবে।