ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন : পাল্টা হামলা তেলআবিবে

রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা, হরমুজ প্রণালী বন্ধ

Printed Edition
first-4
তেলআবিবে ইরানের ক্লাস্টার বোমা হামলা

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • বাহরাইনে মার্কিন বিমানঘাঁটি ধ্বংস আইআরজিসির
  • ইরানের সাথে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ ট্রাম্পের
  • তেহরানে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে বোমাবর্ষণ
  • ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ : মানবিক বিপর্যয়
  • হরমুজ প্রণালী বন্ধে তেলের বাজার অস্থির
  • লেবাননের দক্ষিণে ইসরাইল বিমান হামলা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এখন মহাপ্রলয় চলছে। ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর সঙ্ঘাত এক অভাবনীয় রূপ নিয়েছে। এর পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল ও ঢেউয়ের মতো বিস্তৃত হয়েছে- এখন এটি শুধু ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ছড়িয়ে পড়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নজিরবিহীন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা, বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণার মাধ্যমে এই যুদ্ধ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। সূত্র : আলজাজিরা, বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্সের।

রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিবিসির লাইভ প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে যে, দু’টি ড্রোন সরাসরি দূতাবাস প্রাঙ্গণে আঘাত হেনেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কূটনৈতিক কোয়ার্টারে বিকট বিস্ফোরণের পর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে এবং ভবনে আগুন ধরে গেছে। তবে সৌদি মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সামান্য। এ হামলার পরপরই সৌদি আরব ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সব মিশনে কনসুলার সেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। ওয়াশিংটন এ হামলার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এর ‘জোরালো জবাব’ দেয়া হবে।

বাহরাইনে মার্কিন বিমানঘাঁটি ধ্বংসের দাবি : ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, বাহরাইনের শেখ ঈসা এলাকায় অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ‘ফারস নিউজ’ প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, একের পর এক রকেট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে এবং জ্বালানি ট্যাংকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও বাহরাইনে মার্কিন নৌঘাঁটি থেকেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে।

তেহরানে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে বোমাবর্ষণ : ইসরাইলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ভবনে ‘প্রচুর পরিমাণে গোলাবারুদ’ নিক্ষেপ করেছে। আইডিএফের বিবৃতিতে জানানো হয়, তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানি শাসনব্যবস্থার ‘লিডারশিপ কম্পাউন্ড’, যা শনিবার নিহত হওয়া আয়াতুল্লাহ খামেনি ব্যবহার করতেন। এ ছাড়া তেহরানের পারদিস এলাকায় বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ইসরাইলি বিমান হামলার ভয়াবহতা নিশ্চিত করছে।

ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ : ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-এর তথ্যমতে, গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭৮৭ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ১৭৬টি শিশু রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টাতেই ৯৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরাইলি বিমানবাহিনী ইরানের ৯টি হাসপাতালসহ ১৫৩টি শহরের ৫০৪টি স্থানে এক হাজারেরও বেশি হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে বন্দর আব্বাসের ‘শহীদ বাহোনার পিয়ার’ এবং বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় হামলার খবর পাওয়া গেছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধে তেলের বাজার অস্থির : বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। আইআরজিসি প্রধানের উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই নৌপথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে। এরই মধ্যে ‘আথে নোভা’ নামক একটি মার্কিন সংশ্লিষ্ট তেলের ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান, যাতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে প্রণালীটি এখনো উন্মুক্ত, তবে এ ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমিরাত, ইরাক ও লেবানন রণক্ষেত্র : ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও। দেশটিতে ইরানের ১৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৮১২টি ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে, যাতে তিনজন নিহত ও ৬৮ জন আহত হয়েছেন। অন্য দিকে ইরাকের ইরবিলে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে এমন একটি হোটেলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে শিয়াপন্থী গোষ্ঠী ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’। লেবাননের দক্ষিণেও ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে, যেখানে হিজবুল্লাহ নেতাদের লক্ষ্য করে চালানো অভিযানে সাধারণ বেসামরিক ভবনগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সোমবার ও মঙ্গলবার লেবাননে ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন নিহত এবং ২৪৬ জন আহত হয়েছেন। মুখপাত্র জানিয়েছেন, সোমবার মন্ত্রণালয়ের দেয়া ৫২ জনের মৃত্যুর সংখ্যা একটি কারিগরি ত্রুটি।

ট্রাম্পের কড়া অবস্থান : আলোচনার সুযোগ নেই

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে আলোচনার সব সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, হামলার পর ইরান আলোচনার প্রস্তাব দিলেও এখন আর সেই সময় নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘এখন আলোচনার সময় পার হয়ে গেছে।’ ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধ আরো দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী হতে পারে।

মার্কিন নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার নির্দেশ : নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ১৫টি দেশ থেকে তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছে। এসব দেশের তালিকায় রয়েছে বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরাইল, ফিলিস্তিন, জর্দান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাণিজ্যিক উপায়ে দ্রুত দেশ ত্যাগের এ আহ্বান যুদ্ধের ভয়াবহতারই বহিঃপ্রকাশ।

ভূমিকম্প ও সেন্টকমের পাল্টা দাবি : যুদ্ধের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের গেরাশ অঞ্চলে ৪.৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। যদিও এটি প্রাকৃতিক ঘটনা, তবে যুদ্ধের ডামাডোলে এটি জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। এ দিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, তাদের ধারাবাহিক অভিযানে আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ এখন কেবল সীমান্ত সঙ্ঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তেহরানের কেন্দ্রস্থলে হামলা এবং রিয়াদ-বাহরাইনে মার্কিন স্বার্থে আঘাতের মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ পরিস্থিতি নিরসনে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না, বরং যুদ্ধের পরিধি প্রতি মুহূর্তেই বিস্তৃত হচ্ছে।