হেমন্তের মোহনীয় রূপ: শারমিন নাহার ঝর্ণা
Printed Edition
সময়ের নিয়মেই গুটি গুটি পায়ে চলে আসে হেমন্ত। আবার যায়। বইছে শীতল হাওয়া, ভোরের সবুজ ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু চকচক করছে মুক্তোর মতো। রূপের রানী শরৎ ঋতুর বিদায়ের পর পরই হেমন্তের পদার্পণ। ছয়টি ঋতুর মধ্যে হেমন্ত হলো চতুর্থ ঋতু, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের সমন্বয়ে গঠিত হেমন্ত ঋতু। হেমন্ত মানেই সারি সারি পাকা ধান, এই সময় পাকা ধানে শীতল হাওয়া দোলে, হালকা হালকা সোনালি রোদের পরশ লেগে পাকা ধান চকচক করে। এমন অপরূপ শোভা দেখে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। মানুষের মনকে বিমোহিত করে হেমন্তে সোনালি প্রকৃতি রূপ। আনন্দ আর খুশির জোয়ার ভাসে প্রতিটি কৃষকের ঘরে। কৃষাণ-কৃষাণীর চোখে নতুন স্বপ্ন। আনন্দ আর খুশি বুকে নিয়ে নতুন ধানে গোলা ভরে, নতুন ধান ঘরে তুলে শুরু করে নবান্ন উৎসব, সবার ঘরে তৈরি হয় অনেক রকম পিঠাপুলি, পায়েস, ঢেঁকির দাপর ধুপুর শব্দ চারদিকে, মন খুশিতে উদাস হয়ে যায়। প্রতিটি ঋতুর আছে নিজস্ব সৌন্দর্য, হেমন্ত ঋতুর এক অপরূপ সৌন্দর্য মাঠভরা সোনালি পাকা ধান। হেমন্তকালে বর্ষার পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর মাটি যেন ফিরে পায় নবরূপ আর নবযৌবন। খাল-বিল শুকিয়ে গেলে অনেক ধরনের সুস্বাদু মাছ পাওয়া যায়, যেমন- কৈ, পুঁঁটি, খয়রা, শিং, বোয়াল, বাইম, টাকি ইত্যাদি। এসব দেশীয় মাছ হেমন্ত ঋতুতে অনেক বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বিল হাওড়-বাঁওড় যখন শুকিয়ে যায় তখন এসব মাছ পাওয়া যায়। গরম ভাতের সাথে পুঁটি ভাজির ঘ্রাণ ভেসে আসে গ্রামের সব পাড়ায় পাড়ায়। হেমন্তে অনেক ধরনের ফুল ফোটে- শিউলি, গন্ধরাজ, দেব কাঞ্চন, হিমঝুরি, অশোক, মল্লিকা, হাসনাহেনা- এসব ফুলের মিষ্টি সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়। ভোর বেলায় শিউলি তলায় শিউলি ফুল কুড়িয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মালা গাঁথে। অন্য রকম এক আনন্দের অনুভূতি জাগে হৃদয়ে। হেমন্তকালে অনেক ধরনের টাটকা সবজি পাওয়া যায়, যেমন- ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালংশাক, মুলা ইত্যাদি। হেমন্ত ঋতু এলেই এক অপরূপ সৌন্দর্য গ্রাম-বাংলায় ফুটে ওঠে।
সকালে হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে মাঠ, পাখিদের কিচিরমিচির কলরব, শিশিরভেজা অজস্র শিউলি ফুল শিউলি তলায় পড়ে থাকে, কোথাও কোথাও খেজুরগাছের সাথে বাঁধা রসের হাঁড়ি, হালকা রোদের পরশে সবুজ পাতা হেসে ওঠে। অপূর্ব সৌন্দর্যে ফুটে ওঠে হেমন্তের মিষ্টি সকালে। হেমন্তকালে আকাশ মেঘমুক্ত থাকে, হালকা হালকা নীল রঙে সাজে বিকেলের আকাশ, মাঝে মাঝে রংধনু ওঠে। অতিথি পাখিদের আনাগোনা দেখা যায়, সুনসান নীরবতায়। হেমন্তের স্নিগ্ধ বিকেলে মন প্রফুল্লøতায় ভরে। রাতের আকাশে ঝকঝকে জোছনার আলো কৃষাণ-কৃষাণীর মনে জাগিয়ে তোলে নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা। রাত জেগে তারা নতুন ধান গোলায় ভরে, জোছনার আলোয় রাত জেগে তারা কাজ করে আর মনের সুখে ভাটিয়ালি গান গায়। খুব সুখের মুহূর্ত। হেমন্তের হালকা হালকা শীতল হাওয়া শীতের পূর্বাভাস, হেমন্ত ঋতুর পর শীত আসে। হেমন্তে প্রকৃতি সাজে অপরূপে, হেমন্তের এই রূপ স্নিগ্ধতা ছড়ায় সোনার বাংলায়, বারবার ফিরে আসুক অপরূপ হেমন্ত দুয়ারে, উদাস হয়ে মনটা ভাসুক খুশির জোয়ারে।