বাংলাদেশের জন্য পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের তাৎপর্য
ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল সীমান্ত সুরক্ষা, বাণিজ্য প্রবাহ এবং জলসীমাসংক্রান্ত আলোচনার পাশাপাশি সীমান্তের উভয় পাশের রাজনৈতিক বার্তার ওপরও প্রভাব ফেলবে। শেষ পর্যন্ত, আসল ঘটনা নির্বাচনের ফলাফল নয়, বরং এর পরে কী ঘটে সেটাই হবে মূল বিষয়। নির্বাচনী প্রচারণার বক্তৃতার চেয়ে ভোটের পরের মাসগুলোতে সীমান্ত সুরক্ষা, বাণিজ্য প্রবাহ, পানি নিয়ে আলোচনা এবং রাজনৈতিক বার্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ঢাকার জন্য চ্যালেঞ্জ হলো সতর্ক থাকা এবং সাবধানে প্রতিক্রিয়া জানানো, কারণ যে সম্পর্কগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো পরিচালনা করাও আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। নিরাপত্তা ও অভিবাসী সমস্যা, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণে রাজনৈতিক পরিবেশ প্রভাবিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি অংশ পশ্চিমবঙ্গের ওপর অবস্থিত, যা এটিকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত করেছে। বাণিজ্য পথ, অভিবাসনের ধরন এবং এই ধরনের রাজনৈতিক আখ্যান সবই এই ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যায়। সীমান্তের দুই পারের মানুষও একই ভাষা ব্যবহার করেন। কলকাতা ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে না, কিন্তু সেই নীতি বাস্তবে কিভাবে কাজ করবে তা কলকাতা ঠিক করে দেয়। পুলিশি ব্যবস্থা, বাগাড়ম্বর, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, এমনকি জলসম্পদের আলোচনা সবকিছুই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাবিত হয়। এ কারণেই ঢাকায় এই ভারতীয় রাজ্য নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচনের তাৎপর্য বাংলাদেশের জন্য, এই নির্বাচনের প্রকৃত প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হবে না, তবে এটি আগামী মাসগুলোতে সীমান্ত রাজনীতি, অভিবাসন আলোচনা, বাণিজ্য সম্পর্ক এবং এমনকি পানি বণ্টন আলোচনাকেও প্রভাবিত করবে। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ নিজেও গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই ভোট এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ ও ভারত একটি সমস্যাসঙ্কুল মেয়াদের পর তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে তুলেছিল, যে দেশটি তাকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখত। পরবর্তী মাসগুলোতে ভিসা পরিষেবা স্থগিত, নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা এবং বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেখা যায়। তথাপি, এখন কেন্দ্র-পর্যায়ে সম্পর্কের বরফ গলার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। উভয় পক্ষই এখন তাদের সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতির উত্তেজনা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ শীর্ষ নেতারা অনথিভুক্ত অভিবাসীদের মোকাবেলায় কঠোর সীমান্ত সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বারবার ‘শনাক্ত করো, বাদ দাও এবং বহিষ্কার করো’ নীতিকে সামনে এনেছেন। শাহ এও অভিযোগ করেছেন যে প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসন পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার চিত্র বদলে দিচ্ছে।
তবে সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন যে, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কোনো রকম আলোচনা বা তাদের অবস্থা যাচাই না করেই ভারতীয় নাগরিকদের যাদের অধিকাংশই, বাংলাভাষী মুসলিম তাদের জোর করে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও পশ্চিমবঙ্গে এই বিষয়টিকে কিভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা নির্ধারণ করছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে উত্থানকে বিজেপির নেতারা, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায়, তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করেছেন। এই প্রসঙ্গগুলো বাংলাদেশকে নিরাপত্তা উদ্বেগের সাথে যুক্ত করে। এর ফলে নির্বাচনের পর আরো কঠোর ব্যবস্থা, যার মধ্যে আরো বেশি ‘পুশব্যাক’ (বহিষ্কার) এবং বর্ধিত রাজনৈতিক চাপ অন্তর্ভুক্ত, সেই আশঙ্কায় বাংলাদেশে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে জটিল বিষয়টি হলো পানিবণ্টন। তিস্তা নদী নিয়ে বিবাদটি মূলত টিএমসির বিরোধিতার কারণে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ২০১১ সালে, ব্যানার্জি তিস্তার জন্য একটি প্রস্তাবিত পানিবণ্টন চুক্তি আটকে দিয়েছিলেন, যা ভারতের পূর্ববর্তী সরকারের আমলে হয়েছিল। একই সাথে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জরুরি করে তুলেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের কিন বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা ভাঙা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না, তবে অসম্ভব নয়।’ যদি বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে জয়ী হয়, তাহলে তিস্তা নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে একটি বাধা দূর হবে।
তিনি আরো বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত খসড়া চুক্তিতে বাধা দিয়েছিলেন এবং শুষ্ক মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গে পানির ঘাটতির কথা উল্লেখ করে পানি-বণ্টন চুক্তির বিরোধিতায় অবিচল রয়েছেন।
সুতরাং বিজেপির বিজয়ের সম্ভাবনা বাড়ালেও আমি এখনো খুব সতর্ক থাকব। আমরা জানি না ২০১১ সালে নয়াদিল্লি সত্যিই চুক্তিটি স্বাক্ষর করতে চেয়েছিল কি না এবং পশ্চিমবঙ্গে পানিবণ্টনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু বাস্তব স্থানীয় চাপ রয়েছে, যা সহজে দূর হবে না।
এইসব কারণে আমি মনে করি একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম, কিন উপসংহারে বলেন। ‘আমরা হয়তো নতুন করে কিছু অগ্রগতি দেখতে পারি, যাতে নয়াদিল্লি ঢাকার সাথে সম্পর্ক আরো উন্নত করতে পারে। এটি চীনকে মোকাবেলা করতেও সাহায্য করবে।’
স্বল্পমেয়াদে সম্ভবত আরো বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করা। সেটি কম বিতর্কিত হবে, যদিও বাংলাদেশ সম্ভবত শুষ্ক মৌসুমে আরো বেশি বরাদ্দ চাইবে।
হক বলেন, যে তিস্তায় পানিবণ্টন চুক্তি পশ্চিমবঙ্গে কে শাসন করছে তার চেয়ে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তিনি আরো যোগ করেন, বিজেপি জিতলেও, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না।
যদি টিএমসি আবার ক্ষমতায় আসে, তাহলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। সম্ভাবনার খুব একটা উন্নতি হয় না, হক বলেন। টিএমসি খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব পানির চাহিদাকেই অগ্রাধিকার দেয়, তাই তিস্তার বিষয়ে অগ্রগতির সম্ভাবনা বেশ সীমিত।
এটি বাংলাদেশের জন্য একটি কঠিন উভয় সঙ্কট তৈরি করে। একটি ফলাফল টিএমসির বিজয় আরো স্বস্তিদায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ দেবে, কিন্তু পানি বণ্টনের বিষয়ে অগ্রগতি হবে সীমিত। অন্যটি বিজেপির জয় পানি আলোচনার একটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি করবে, কিন্তু এর সাথে অনিশ্চয়তাও থাকবে। সংখ্যালঘু রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিতের ক্ষেত্রে, পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রচারণার বক্তব্যে ধর্ম এবং অভিবাসনসহ পরিচয়ের বিষয়গুলো ক্রমান্বয়েই প্রাধান্য পাচ্ছে। এই ধরনের আখ্যান সীমান্তের ওপারে প্রবলভাবে প্রতিধ্বনিত হয় এবং উভয় দেশের জনমতকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই রাজনৈতিক বয়ানে একটি হাতিয়ার হয়ে ওঠে, বলেছেন হক। এটি এক ধরনের কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করে এবং তা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরে ইন্ধন জোগায়। ফলে সেখানে [পশ্চিমবঙ্গে] রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংগঠিত করার জন্য বাংলাদেশ একটি সুবিধাজনক বিষয়ে পরিণত হয়।
নির্বাচনের পরেও এই গতিপ্রকৃতি অদৃশ্য হওয়ার আশঙ্কা কম। ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে, বিজেপি এই বিষয়গুলো ব্যবহার করতে থাকবে, তিনি বলেন। এর তীব্রতা হয়তো ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অন্তর্নিহিত গতিপ্রকৃতি একই থাকবে।