মানুষ প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যৌথ প্রকল্প ৩ মন্ত্রণালয়ের

Printed Edition
back-1
রাজধানীতে ওয়ান হেলথ কার্যক্রম বিষয়ক সেমিনারে বক্তব্য রাখেন তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে আলাদা করে না দেখে একক সমন্বিত সুরক্ষা কাঠামো গড়তে যৌথ প্রকল্প নিয়ে আগাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রাণীর রোগ, মানুষের সঙ্কট- সব একই চক্রে ঘুরপাক খায়; তাই সমন্বয়হীন নীতি ও এককভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অমূলক। শিগগিরই তিন মন্ত্রণালয়ের যৌথ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা হবে। এই প্রকল্পে প্রতিটি মন্ত্রণালয় থেকে একজন করে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) দায়িত্ব নেবেন।

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি তারকা হোটেলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ‘ওয়ান হেলথ কার্যক্রম : সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ কৌশল’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এতে সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। অতিথি হিসেবে ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পানি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা: মো: সায়েদুর রহমান।

সভাপতির বক্তব্যে ফরিদা আখতার বলেন, ওয়ান হেলথ শুধু মুখের কথা নয়, এর পেছনে দৃঢ় কমিটমেন্ট প্রয়োজন। ‘মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি, যারা অন্য প্রাণীর বিষয়ে চিন্তা করতে পারে। তাই প্রাণীর নিরাপত্তা ও রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত দায়িত্ব মানুষেরই।

প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা জানান, ওয়ান হেলথের গুরুত্ব তুলে ধরতে তিন মন্ত্রণালয় মিলে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই একটি নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কপ-৩০ সম্মেলনে পরিবেশের আলোচনা থাকলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছিল না। ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবার ঢুকেছে, আমরা থাকবই।’

উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জাতীয় পর্যায়ে একটি অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। অনেক কিছু অনলাইনে করা যায়।’ রিজওয়ানা হাসান বলেন, যে মন্ত্রণালয় দ্রুত কাজ করতে পারে তাদের দায়িত্ব দিতে হবে, যদিও দ্রুত কাজের পেছনে কখনো সক্ষমতার ঘাটতি থাকে। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি সরকারিভাবে জমি কেনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছরের প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণেই আড়াই-তিন বছর চলে যায়।’

অধ্যাপক ডা: মো: সায়েদুর রহমান বলেন, দেশে দেড় লাখ চিকিৎসক থাকলেও দেড় হাজারও ওয়ান হেলথ সম্পর্কে জানেন না। তিনি বলেন, ‘পশুস্বাস্থ্য খারাপ হলে মানবস্বাস্থ্যের ওপরই প্রভাব পড়ে। এই প্রকল্পকে বাংলাদেশকে উন্নত অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে, সকল জীবিত প্রাণীর সুস্থতাই হবে লক্ষ্য।’

অনুষ্ঠানে সমন্বিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা: তাহমিনা শিরীন, বন অধিদফতরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক মো: জাহিদুল কবির এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো: আবু সুফিয়ান। উন্মুক্ত আলোচনা পরিচালনা করেন স্বাস্থ্যসচিব মো: সাইদুর রহমান।

সভায় বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো: মোস্তাফিজুর রহমান, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ, স্বাস্থ্যসচিব মো: সাইদুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. কাইয়ুম আরা বেগম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, এখানে প্রাণী ও মানুষের ঘনিষ্ঠতায় রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি। তাই যথাযথ সমন্বয় জরুরি। ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, ঋণ নিয়ে প্রকল্পের কাজ হলে বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, সমন্বিতভাবে কাজ করতে গেলে বাধা আসে; তাই প্রিভেন্টিভ কেয়ারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্বাস্থ্যসচিব সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা সব কাজ শেষের দিকে করি। সময়সীমা দিলেও অনেকে কাজ করতে চায় না। আমাদের ইগো ও ‘আমিত্ব’ ছাড়তে হবে।’ ড. কাইয়ুম আরা বেগম বলেন, ওয়ান হেলথ মানে- পরিবেশ, মানুষ ও প্রাণির স্বাস্থ্যকে একসাথে দেখা। তিনি উদাহরণ দেন ‘মাছ চাষে সফলতার পর আমরা পুকুরে গোসলই করতে পারি না, এটা সাস্টেইনেবল প্রজেক্টের বিপরীত।’

প্রস্তাবনা : প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. আবু সুফিয়ান জানান, পরিবেশ, প্রাণিস্বাস্থ্য ও মানবস্বাস্থ্য সবই একসাথে করতে হবে। এই কাজ করতে আমাদের পলিসি বা উচ্চ পর্যায়ে কমিটমেন্ট থাকতে হবে। কারণ উচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতা ছাড়া এসব অসম্ভব। ঢাকা ও স্থানীয় পর্যায়ে তিন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কিভাবে কাজ করা যায়, তাতে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ আমাদের এক ছাতার নিচে এসে কাজ করতে হবে।

ডিএলএসের ডিজি জানান, কোভিড-১৯ এর পর আমরা যদি এই কাজগুলো শুরু না করি- আরেকটি যদি কোভিড আসে, মহামারী আসে, সেই মহামারী আমরা কিভাবে কন্ট্রোল করব? সেজন্য প্যান্ডামিক ফান্ড করেছে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন। এটা হলো ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের গ্র্যান্ট মানি (অনুদান) প্যান্ডামিক ফান্ড। প্রাথমিকভাবে ২৫ মিলিয়ন ইউএস ডলারের অনুদান দিতে প্যান্ডামিক ফান্ড সেক্রেটারিয়েট সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন ডকুমেন্ট সাবমিট করতে হবে। আরো সময় লাগবে। এই ফান্ডের আওতায় তিন মন্ত্রণালয়ের একটি সমন্বিত প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।