গাজায় ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ৪৫ লাশ উদ্ধার
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- আইসিসির তদন্ত বন্ধে ইসরাইলের আবেদন খারিজ
- দখলকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত
- ফিলিস্তিনি কিশোরকে বুকে গুলি করে হত্যা
- পশ্চিমতীরে নতুন বসতি অনুমোদনের নিন্দা কাতারের
নারকীয় তাণ্ডব চালিয়ে ফিলিস্তিনের গাজা সিটির কিছু এলাকা ছেড়ে গেছে ইসরাইলি বাহিনী। তাদের সরে যাওয়ার পর সেখানে সংঘটিত গণহত্যার ভয়াবহ চিত্র একের পর এক সামনে আসছে। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স কর্মীদের তথ্যে সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে। কর্মীরা একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে অন্তত ৪৫টি লাশ উদ্ধার করেছেন। ইসরাইলি হামলায় ভবনটি অনেক আগেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
আলজাজিরা জানায়, ওই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া পরিবারের এক সদস্য আবু মুহাম্মদ সালেম দাবি করেন, পরিবারের সব সদস্যের লাশ উদ্ধার করে যথাযথভাবে দাফন করা হোক। তিনি বলেন, ‘আমার একটাই আশা, শেষ লাশটিও উদ্ধার করা হোক। সদস্যরা অন্তত স্বতন্ত্রভাবে কবরস্থানে দাফন হওয়ার সুযোগ পাক। যাতে আমরা অন্তত জানতে পারি, তারা কোথায় দাফন হয়েছেন।’ মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে বলেন, বড় ও শক্তিশালী খননযন্ত্র থাকলে উদ্ধারকাজ আরো দ্রুত করা যেত। বর্তমান গতিতে উদ্ধারকাজ চালতে থাকলে পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে। গাজা কর্তৃপক্ষ বলছে, ফিলিস্তিন ছিটমহলে ভারী বৃষ্টিপাতে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ভবন ধসে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা লাশ উদ্ধার কঠিন হয়ে পড়েছে।
আইসিসির তদন্ত বন্ধে ইসরাইলের আবেদন খারিজ : দ্য টাইমস অব ইসরাইল জানায়, গাজা যুদ্ধের তদন্ত বন্ধে ইসরাইলের আবেদন খারিজ করেছে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি)। গত সোমবার আদালতের আপিল বিভাগ ইসরাইলের করা একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জের মধ্যে এই আবেদনটি খারিজ করে দেয়। আইসিসির আপিল বিভাগের বিচারকরা নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আদালতের এখতিয়ারাধীন অপরাধের তদন্তে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী সংগঠন হামাসের হামলার পরের ঘটনাগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
এই রায়ের ফলে তদন্ত অব্যাহত থাকবে এবং গত বছর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল থাকবে।
ইসরাইল হেগভিত্তিক এই আদালতের এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটি গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও অস্বীকার করে আসছে। ইসরাইল বলছে, ৭ অক্টোবরের পর হামাসকে নির্মূল করতেই তারা গাজায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। আইসিসির এই রায় ইসরাইলের করা একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জের মাত্র একটি বিষয়ে প্রযোজ্য। আদালতের এখতিয়ার ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে অন্যান্য চ্যালেঞ্জের বিষয়ে কবে সিদ্ধান্ত আসবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সময়সূচি জানানো হয়নি।
দখলকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত : গত সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার সকালে দখলকৃত পশ্চিমতীরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সহিংস অভিযান চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। স্থানীয় সূত্র ও ওয়াফা বার্তা সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়, ইসরাইলি সেনারা টুবাস শহর ও তাম্মুন এলাকায় অভিযান চালায়। তারা বেথলেহেমের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের তুকুয়া শহরে অভিযান চালিয়ে এমন এক শিশুর বাড়িতে প্রবেশ করে, যাকে আগে ইসরাইলি বাহিনী হত্যা করেছিল।
এ ছাড়া দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেমের আর-রাম এলাকায় এক তরুণ ফিলিস্তিনিকে হাঁটুতে গুলি করে আহত করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই একই এলাকায় আরেকজনকে পায়ে গুলি করে হাসপাতালে নেয়া হয়। জেনিন, রামাল্লাহ ও নাবলুসেও আরো অভিযান চালানো হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। এসব অভিযানে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ফিলিস্তিনি কিশোরকে বুকে গুলি করে হত্যা : দখলকৃত পশ্চিমতীরের দক্ষিণাঞ্চলের বেথলেহেম শহরের পূর্বে তুকু শহরে ১৬ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি কিশোরকে বুকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আম্মার ইয়াসের মোহাম্মদ তামারা (১৬) নামের এক কিশোর বুকে গুলি বিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে। ইসরাইলি বাহিনী বেথলেহেমের দক্ষিণ-পূর্বে তুকু শহরে অভিযানের সময় তাকে গুলি করে।’ এএফপি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করলে তারা এক বিবৃতিতে জানায়, তুকু এলাকায় একটি ‘সংঘর্ষ’ হয়েছে। সেখানে তাদের সৈন্যদের ওপর পাথর ছোড়া হয়েছে।
সেখানে আরো বলা হয়, সৈন্যরা দাঙ্গা ছত্রভঙ্গ করতে শক্তি প্রয়োগ করে এবং পরে একজন উসকানিদাতাকে শনাক্ত করে গুলি চালালে তিনি নিহত হন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঘটনাটি পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইল পশ্চিমতীর দখল করে আছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সেনা বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে হামাসের সদস্যদের পাশাপাশি বহু বেসামরিক মানুষও রয়েছে।
পশ্চিমতীরে নতুন বসতি অনুমোদনের নিন্দা কাতারের : দখলকৃত পশ্চিমতীরে ১৯টি নতুন ইসরাইলি বসতি অনুমোদনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার। দেশটি এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইন ও ফিলিস্তিনিদের অধিকারের ‘চরম লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরাইলি সরকারের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বৈধতার রেজ্যুলেশন, বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবের সরাসরি লঙ্ঘন।
ওই প্রস্তাবে পশ্চিমতীরের ইসরাইলি বসতিগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এই অনুমোদন ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারকে প্রকাশ্যভাবে পদদলিত করছে। কাতার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা ইসরাইলের বসতি সম্প্রসারণ নীতি বন্ধে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা পশ্চিমতীরে ১৯টি অবৈধ বসতিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা অনুমোদন করে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি দীর্ঘ দিনের ভূমি দখল ও জনসংখ্যাগত প্রকৌশল প্রকল্পকে আরো গভীর করছে।
যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ না হলে মানবিক বিপর্যয় আরো বাড়বে : গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়িত না হলে মানবিক পরিস্থিতির ভয়াবহভাবে অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষক মুহান্নাদ সেলুম। তিনি দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের সমালোচনামূলক নিরাপত্তা অধ্যয়নের সহকারী অধ্যাপক।
আলজাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেলুম বলেন, দ্বিতীয় ধাপে যেতে হলে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ নির্ধারণ করতে হবে, যা বর্তমানে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি জানান, ইউরোপসহ বিভিন্ন পক্ষ গাজায় মোতায়েনের কথা ভাবা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ তারা সরাসরি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জড়াতে চায় না।
সেলুম আরো বলেন, সীমিত মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিলেও ইসরাইল গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, যা যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিক লঙ্ঘন। তার মতে, ইয়েলো লাইনের চারপাশে প্রায় ৫০০ মিটার এলাকা কার্যত ‘কিল জোন’, যা পর্যবেক্ষণ করা হবে কিভাবে- সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বৃষ্টিতে প্লাবিত আল-শিফা হাসপাতাল ও হাজারো তাঁবু
আনাদোলু এজেন্সি জানায়, গাজা উপত্যকায় ভারী বৃষ্টিপাতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভোরের দিকে টানা বৃষ্টিতে গাজার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের একাধিক অংশ পানিতে তলিয়ে যায়।একই সাথে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের বসবাসরত হাজার হাজার তাঁবুও প্লাবিত হয়। গাজা সিটির আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ ও রোগী ভর্তি এলাকার কিছু অংশে পানি ঢুকে পড়ে। এর ফলে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গাজার সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল সতর্ক করে বলেন, ‘ইসরাইলি হামলায় আংশিক ধ্বংস হওয়া হাজার হাজার ঘর যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাস পরিস্থিতিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে’।
এ দিকে গাজায় ঠাণ্ডায় আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক লিখিত বিবৃতিতে জানায়, দুই সপ্তাহ বয়সী মুহাম্মদ খলিল আবু খাইরের শরীরের তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায়। তাকে দুই দিন আগে গাজা সিটির একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ১০ ডিসেম্বর থেকে টানা তিন দিন স্থায়ী ‘স্টর্ম বায়রন’-এর কারণে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এর ফলে তাঁবু প্লাবিত হয় এবং দুর্বল স্থাপনাগুলো ধসে পড়ে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানায়, চরম ঠাণ্ডাজনিত কারণে এখন পর্যন্ত ১৪ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। ৫৩ হাজার তাঁবু আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।এই দুর্যোগে গাজা অঞ্চলে প্রায় চার মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।