ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিলেন বিশ্লেষকরা

ইরান যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারছে না পুঁজিবাজার

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারগুলো ইরান যুদ্ধের প্রভাব কমবেশি কাটিয়ে উঠলেও দেশের পুঁজিবাজারগুলো এ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারছে না। গতকাল সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারে সূচকের বড় ধরনের পতন ঘটে। এর আগে গত মঙ্গলবার দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের রেকর্ড পতন ঘটলেও বুধবার বাজারগুলোতে চাপ সামলে ওঠার ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু গতকাল আবারো বিক্রয়চাপে অস্থির ছিল দেশের দুই পুঁজিবাজার। দিনের শুরুতে কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে বিক্রয়চাপ যা দিনশেষে দুই পুঁজিবাজারের সব সূচকের বড় ধরনের অবনতি ঘটায়।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা এ মুহূর্তে ধৈর্যধরে বাজার পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। তারা মনে করছেন, বিগত রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল ইরান যুদ্ধেও তেমনটি ঘটতে পারে- এমন ধারণা থেকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। এটিই বাজারে বিক্রয়চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে পতন ঘটছে সূচকের। তারা মনে করেন যুদ্ধের বিষয়টি আমাদের কারোই হাতে নেই। এটি কত দীর্ঘায়িত হবে তাও আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমাদের বিনিয়োগ নিরাপদ রাখার দায়িত্ব আমাদের। তাই হুট হাট শেয়ার বিক্রি বা বিক্রয়াদেশ না দিয়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। কারণ সব কিছুরই শেষ আছে। যুদ্ধও একসময় শেষ হবে। কিন্তু আমরা অস্থির বা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে পুঁজি হারালে তা আর ফিরে পাওয়ার খুব একটা সুযোগ নেই। তাই এ মুহূর্তে ধৈর্য ধরার বিকল্প নেই।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৮২ দশমিক ১৯ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৩২৩ দশমিক ০৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ২৪০ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ৮৬ ও ১৩ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট। অনুরূভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিাবাজর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এ দিন ২২০ দশমিক ০০ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ২৫৯ দশমিক ৪৩ ও ১৩০ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট।

সূচকের অবনতি বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে ডিএসইর লেনদেনে। গতকাল ডিএসইর লেনদেন নেমে আসে ৪৫৯ কোটি টাকায় যা আগের দিন অপেক্ষা ১২৩ কোটি টাকা কম। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫৮২ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে ঢাকা বাজারের লেনদেন। মঙ্গলবার ৮৮৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে ডিএসই। অন্য দিকে সূচক পতনের মধ্যেই বড় উন্নতি ঘটেছে সিএসইর লেনদেনে। গতকাল দেশের দ্বিতীয় এ পুঁজিবাজারটি ৪১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। অথচ আগের দিন বাজারটির লেনদেন ছিল মাত্র আট কোটি টাকা। তবে এ দিন বাজারটিতে তিনটি কোম্পানিরই লেনদেন হয়েছে ৩৭ কোটি টাকার। এর মধ্যে সিটি ব্যাংকের ২০ কোটি টাকা, ওরিয়ন ইনফিউশন ১০ কোটি টাকা ও আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সাত কোটি টাকার শেয়ার বেচাকেনা হয়েছে।

গতকাল মতিঝিলে অবস্থিত ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফোরগুলোতে বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি আগের কয়েক দিনের মতো দেখা যায়নি। উপস্থিত ট্রেডারদের সাথে কথা বলে জানা যায় শেয়ার ক্রয়ের চেয়ে বিক্রির আদেশই বেশি পাচ্ছেন। অনেকে তো হাউজে আসার পরিবর্তে বাসায় বসেই টেলিফোনে বিক্রয়াদেশ দিয়ে দিচ্ছেন। তাদের একটা বড় অংশই আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করার চিন্তা করছেন। একটি হাউজে উপস্থিত কয়েকজন বিনিয়োগকারীরর সাথে কথা বললে তারা নয়া দিগন্তকে জানান, যুদ্ধ সবে শুরু হলো। কবে শেষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় শেয়ার বিক্রি করে সেইফ সাইডে থাকাই ভালো মনে করছেন তারা। কারণ সামনের দিনগুলোতে যুদ্ধ পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা কেউ বলতে পারে না। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ অনেক দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে।

গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ওরিয়ন ইনফিউশন। ৩২ কোটি ২৬ লাখ টাকায় কোম্পানিটির আট লাখ ৪৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়েছে গতকাল। ২৫ কেটি ২২ লাখ টাকায় ৮২ লাখ ৯২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সিটি ব্যাংক ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, ইনটেক অনলাইন, রবি অজিয়াটা, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, সি-পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো।

বৃহস্পতিবার ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানি ইনটেক অনলাইন। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল বস্ত্র খাতের এস্কয়্যার নিট কম্পোজিট পিএলসি। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে রহিমা ফুড করপোরেশন, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, জনতা ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, আইসিবি এমপ্লয়িজ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, শাইন পুকুর সিরামিকস, আমান কটন ফেব্রিক্স ও শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।

এ দিন ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ফার্স্ট ফিন্যান্স। ব্যাংকবহির্ভূত এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি ১০ শতাংশ দর হারায় গতকাল। ৮ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল একই খাতের কোম্পানি প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, অ্যাপোলো ইস্পাত, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, ন্যাশনাল ব্যাংক, ফিনিক্স ফিন্যান্স, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ফার ইস্ট ফিন্যান্স ও আরামিট সিমেন্ট।