বুড়িগঙ্গার তীরের দস্তরখান : সদরঘাটে যাত্রী ও শ্রমিকের একীভূত ইফতার

লঞ্চে গণ-ইফতার

Printed Edition
back-3
ঢাকা সদরঘাট এলাকায় লঞ্চে বসে ইফতারির আগে দোয়া করেন যাত্রীরা : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

বুড়িগঙ্গার ঘোলা জলের ওপর দিয়ে যখন বিকেলের মরা রোদ চিকচিক করে ওঠে, তখন সদরঘাট যেন এক অন্য জীবনের গল্প বলে। একদিকে আধুনিক ঢাকা, অন্যদিকে কেরানীগঞ্জের আদি স্পন্দন; মাঝখানে বয়ে চলা নদীটি যেন এক মহাকালের সাক্ষী। রমজানের এ তপ্ত বিকেলে এখানে এসে থমকে দাঁড়ায় শহরের যান্ত্রিকতা। কেউ ফিরছেন নাড়ির টানে দূর গন্তব্যে, কেউ আবার অন্যকে পৌঁছে দিতে বিসর্জন দিচ্ছেন নিজের সুখ। এ যে যাওয়া-আসার খেলা, এর মাঝে ইফতারের মুহূর্তটি যেন এক টুকরো ‘পরকাল’ বা আধ্যাত্মিক প্রশান্তির প্রদর্শনী যেখানে নেই কোনো বিভেদ, আছে কেবল মানুষের সাথে মানুষের অকৃত্রিম মিলন।

বাংলাদেশ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল এক নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (ইওডঞঅ)-র তথ্যমতে, স্বাভাবিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২.৫ লাখ থেকে তিন লাখ মানুষ যাতায়াত করেন। উৎসবের মৌসুমে এ সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে দৈনিক ১৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে দেশে সচল নৌপথের দৈর্ঘ্য বর্ষাকালে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার এবং অনুমোদিত রুট রয়েছে প্রায় ৪১টি।

তবে উন্নয়নের হাওয়ায় সদরঘাটের চিরচেনা চিত্রে কিছুটা বদল এসেছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীচাপ অনেকটা সড়কপথে স্থানান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ইইঝ) মতে, পূর্বে সদরঘাট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০-৯০ হাজার মানুষ যাতায়াত করলেও বর্তমানে তা ৫০-৬০ হাজারে নেমে এসেছে। বিশেষ করে বরিশাল ও ভোলা রুটের যাত্রীরা এখন আগের চেয়ে কম সময়ে সড়কপথে যাতায়াত করছেন, যার প্রভাব পড়েছে লঞ্চের যাত্রীসংখ্যায়।

ইফতারের ধরন ও পরিবেশ

আজানের মিনিট দশেক আগেই পাল্টে যায় লঞ্চের ডেক আর পন্টুনের দৃশ্যপট। লঞ্চের রেলিং ঘেঁষে বা প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে গোল হয়ে বসেন শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীরা। অনেক সময় বড় গামলায় মুড়ি মাখানো হয়, যা সবার মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়। লঞ্চ শ্রমিকরা নিজেদের কাজ সামলে নিয়ে ডেক পরিষ্কার করে সেখানেই দস্তরখান বিছিয়ে দেন। যাত্রী ও শ্রমিকদের মাঝে এখানে কোনো দূরত্ব থাকে না; বরং একে অপরের গ্লাস ভরে দেন শরবতে।

মেন্যুতে থাকে মুড়ি মাখানো, পিঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ এবং চটপটি স্টাইলের ছোলা ভুনা। সাথে থাকে তরমুজ, পেঁপে বা মাল্টার টুকরো এবং তৃষ্ণা মেটাতে লেবুর শরবত বা রুহ-আফজা।

পন্টুন থেকে ডেক

লঞ্চের ইঞ্জিনের গর্জন আর কুলিদের হাঁকডাকের মধ্যেই যখন আজানের ধ্বনি ঘনিয়ে আসে, তখন পন্টুন আর লঞ্চের ডেকে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

সিনিয়র মাস্টার (লঞ্চ চালক) বলেন, সবাই যখন পরিবারের সাথে ইফতার করার জন্য অস্থির হয়ে লঞ্চে ওঠে, তখন আমাদের বুকটাও একটু হাহাকার করে। কিন্তু স্টিয়ারিং হুইল ধরার পর সেই কষ্ট ভুলে যাই। হাজার হাজার মানুষকে তাদের আপনজনের কাছে নিরাপদে পৌঁছে দেয়াটাই আমাদের ইবাদত। মাঝনদীতে ইঞ্জিনের শব্দের সাথে আজান শুনে এক ঢোক পানি খেয়েই আমরা তৃপ্তি পাই।

লস্কর রাশেদুল ইসলাম বলেন, ইফতারের সময় আমাগো বিরাম নাই। কেউ দড়ি বাঁধে, কেউ সিঁড়ি ধরে। যাত্রীরা যখন শান্তিতে ইফতার করে, হেই দৃশ্য দেইখাই আমাগো পেট ভইরা যায়। আমরা শ্রমিকরা সবাই মিলা ডেকের এক কোণায় বইসা মুড়ি মাখাই। চেনা নাই জানা নাই কোনো যাত্রী আইসা পাশে বসলে নিজের থালা থেইকা তারে ইফতার তুলে দেই। এটাই সদরঘাটের মহব্বত।

পটুয়াখালীগামী যাত্রী কামরুল হাসান বলেন, বাসে জ্যাম আর ঝক্কি বেশি, তাই লঞ্চই ভরসা। লঞ্চের ডেকে খোলা বাতাসে সবার সাথে মিলেমিশে ইফতার করার একটা আলাদা আনন্দ আছে। পাশের মানুষটা কে জানি না, কিন্তু ইফতারের সময় আমরা সবাই এক পরিবারের মতো হয়ে যাই। এটাই তো রোজার শিক্ষা।

টার্মিনালের ক্ষুদ্র ইফতার বিক্রেতা বলেন, সারা দিন রোজা রাইখা রোদে পুইড়া ইফতারি বেচি। নিজের ইফতারের কথা ভাবার সময় পাই না। আজান দেয়ার আগ মুহূর্তে কোনো শ্রমিক ভাই বা অন্য দোকানদার ডাক দিয়া কয় চাচা আইসেন, একসাথে ইফতার করি। এ যে একে অপরের লাইগা টান, এইটাই আমাগো এ সদরঘাটের আসল সৌন্দর্য।

রাঙ্গাবালীগামী লঞ্চের একজন চুকানি বলেন,পরিবারের কথা মনে পড়লে চোখ দিয়া পানি আহে। কিন্তু চাকরি তো করন লাগবো। আমাগো ইফতারে হয়তো পদের বাহার নাই, কিন্তু অভাব নাই ভালোবাসার। বড় গামলায় মুড়ি মাখাইয়া যখন দশজনে একসাথে হাত দেই, তখন মনে হয় দুনিয়াটা কত সুন্দর।

মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজান যখন বুড়িগঙ্গার বাতাস ছুঁয়ে যায়, তখন গন্তব্যের তাড়া ভুলে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে যান। কেউ পৌঁছাবেন আপন শিকড়ে, কেউ অন্যকে পৌঁছে দিয়ে খুঁজে পাবেন সার্থকতা। সদরঘাটের এ চিত্র কেবল একটি ঘাটের গল্প নয়, এটি ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এক টুকরো মানবিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।