ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি

অধ্যাদেশ চূড়ান্ত পর্যায়ে কিন্তু সঙ্কট কি কাটছে?

Printed Edition
back-3
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারির দাবিতে শিক্ষা ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার সাত সরকারি কলেজকে এক কাঠামোর আওতায় এনে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা শিক্ষাজগতে যেমন এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, তেমনই সৃষ্টি করেছে এক জটিল প্রশাসনিক-রাজনৈতিক সঙ্কট। আর সেই সঙ্কটের মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে- ১ জানুয়ারি থেকেই শুরু হবে নতুন ব্যাচের ক্লাস।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- আইনি কাঠামো ও স্ট্যাটুটরি অথরিটি অনিশ্চিত থাকলে এই ক্লাস শুরু আসলে কতটা টেকসই হবে? আর কে লাভবান হবে এই হড়বড় করে এগোনো প্রক্রিয়ায়?

অধ্যাদেশ চূড়ান্তে দৌড়ঝাঁপ- এর পেছনে কি চাপ আছে?

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বলছে, ২৫ ডিসেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় খসড়া অধ্যাদেশ ‘চূড়ান্ত’ করা হবে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে- সাত কলেজের শিক্ষকরা স্কুলিং কাঠামোর বিরোধিতায় অনড়; শিক্ষা ক্যাডারের বড় অংশ মনে করছেন- নতুন কাঠামো তাদের পদোন্নতি ও স্ট্যাটাস ঝুঁকিতে ফেলবে; শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছে- আইনি কাঠামো নিশ্চিত না হলে তাদের সার্টিফিকেটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তাই দ্রুত অধ্যাদেশ চাই; আবার অন্য অংশ মনে করছে- নতুন কাঠামো কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করবে এবং উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্স-মাস্টার্স একসাথে চালানো অযৌক্তিক।

অর্থাৎ যে প্রশ্নগুলো সমাধান হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোকেই এখন নিয়মতান্ত্রিকতার আড়ালে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে- এমন অভিযোগ উঠছে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে।

‘পাঁচ হাজার মতামত’- কিন্তু সেগুলো কতটা বিবেচনায়?

মন্ত্রণালয় দাবি করছে- খসড়া অধ্যাদেশের ওপর পাঁচ হাজারের বেশি মতামত এসেছে এবং সেগুলো ‘বিবেচনা করে’ সংশোধন চলছে। কিন্তু কয়েকজন শিক্ষক প্রতিনিধি এই প্রতিবেদককে বলেন- ‘মতামত নেয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল বিরোধ থাকা ‘স্কুলিং কাঠামো’ নিয়ে মন্ত্রণালয় কোনো স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি।’

আরেকজন বলেন- ‘মতামত নেয়ার প্রক্রিয়াটা ছিল আনুষ্ঠানিকতা- আসল সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত।’ তাহলে কি মতামত গ্রহণ শুধু চাপ কমানোর কৌশল- এ প্রশ্ন উঠছে।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠন নাকি ৭ কলেজের প্রশাসন পুনর্গঠন?

শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, সাত কলেজে- পরীক্ষার বিলম্ব, প্রশাসনিক দুর্নীতি, একাডেমিক বিশৃঙ্খলা, শিক্ষক সঙ্কট- এসব সমাধানই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের মূল লক্ষ্য। কিন্তু এই যুক্তিও এখন প্রশ্নের মুখে।

কারণ- বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের পরও সাত কলেজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, কলেজের শিক্ষকের পদ, এইচএসসি কার্যক্রম, সবই আগের মতো থাকবে।

তাহলে কিভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয় ‘উন্নতি’ আনবে- তা পরিষ্কার নয়। এটি কি তবে এক দফা প্রশাসনিক রিব্র্যান্ডিং, যার বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো স্পষ্ট নয়?

ক্লাস শুরু ১ জানুয়ারি- কিন্তু কোন আইনে, কোন কাঠামোতে?

মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, সাত কলেজে ভর্তি হওয়া ৯ হাজার ৩৮৮ শিক্ষার্থী ১ জানুয়ারি থেকেই ক্লাস শুরু করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- অধ্যাদেশ ছাড়া ক্লাস চালানো হলে ছাত্রদের ডিগ্রি কোন আইনি কাঠামোয় প্রদান করা হবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে- বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল নেই, সিনেট নেই, রেগুলেশন নেই, ফ্যাকাল্টি বণ্টন অনিশ্চিত, তাহলে ‘ক্লাস শুরু’ আসলে নগদ সমস্যাকে আড়াল করার প্রচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।

একজন সাবেক ইউজিসি সদস্য বলেন- ‘আইন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় চালানো যায় না। ক্লাস শুরু করিয়ে সরকার শুধু আন্দোলন সামাল দিতে চাইছে।’

শিক্ষক বনাম শিক্ষার্থী- কার স্বার্থ কোথায়?

এই সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই পক্ষ- ১. শিক্ষক (বিশেষ করে শিক্ষা ক্যাডার) যাদের পদোন্নতির পথ সঙ্কুচিত হবে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ‘নির্বাচিত শিক্ষক’ হবেন না, ‘বিসিএস সাধারণ শিক্ষা’ ক্যাডারের শক্তিশালী অবস্থান দুর্বল হওয়ার শঙ্কা, কলেজের স্বাতন্ত্র্য হারানোর ভয় রয়েছে তাদের।

২. শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যারা দ্রুত আইনি কাঠামো নিশ্চিত করে অস্থিরতা থেকে মুক্তি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো ও বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যান্ডিং চায়।

৩. আরেক অংশের অবস্থান হলো- স্কুলিং কাঠামোতে কলেজের পরিচয় নষ্ট, উচ্চমাধ্যমিক-অনার্স-মাস্টার্স এক ক্যাম্পাসে ‘অযৌক্তিক বিশৃঙ্খলা’ অর্থাৎ সঙ্কট শুধু অ্যাকাডেমিক নয়- এটি প্রশাসনিক ক্ষমতা, ক্যাডারের ভবিষ্যৎ, প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা, সবকিছুর সমন্বয়ে এক বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব।

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য : ‘সময়সাপেক্ষ, তবে এগোচ্ছে’

মন্ত্রণালয়ের অবস্থান হলো- সব মতামত পর্যালোচনা হচ্ছে, আইনগত দিক দেখা হচ্ছে, ১ জানুয়ারি ক্লাস শুরু হবে, ২৫ ডিসেম্বরের আগে সংশোধিত খসড়া তৈরি হবে, সাত কলেজের স্বাতন্ত্র্য, নারী কলেজের বৈশিষ্ট্য, মালিকানা- সব বিবেচনায় আছে।

কিন্তু অনুসন্ধানী প্রশ্নগুলো এখনো উন্মুক্ত- স্কুলিং কাঠামো বদলানো হবে কি? শিক্ষক ক্যাডারের স্ট্যাটাস কিভাবে সংরক্ষিত হবে? এইচএসসি কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সহাবস্থান করবে কিভাবে? সাত কলেজের ভবিষ্যৎ প্রশাসন কেমন হবে? ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্কুলিং মডেল’ কি আদৌ বাস্তবসম্মত? সঙ্কট কি কাটছে- নাকি আরো জটিল হচ্ছে?

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এখন- একদিকে শিক্ষার মানোন্নয়নের আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ, অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতা, শিক্ষক অসন্তোষ, শিক্ষার্থীর অনিশ্চয়তা। ভর্তি হওয়া প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে- ২৫ ডিসেম্বরের বৈঠক আসলে কী সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ১ জানুয়ারি ক্লাস শুরুর ঘোষণা কাগজে-কলমে নাকি বাস্তবতায় পরিণত হয়।