আ’লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে দ্বিতীয় দিনেও উত্তাল ঢাবি

জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম

হারুন ইসলাম
Printed Edition

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের বিচার, নিবন্ধন বাতিল, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য ও শাহবাগ এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশগুলো অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জুলাই গণহত্যার বিচার ও আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনে চেষ্টাকারীদের হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

ওয়ারিয়র্স অব জুলাইয়ের আলটিমেটাম : আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে জুলাই গণ-আন্দোলনে আহতদের সংগঠন ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’। বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত না এলে ঢাকা শহর অবরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। গতকাল দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নিয়ে এ ঘোষণা দেন সংগঠনটির নেতারা।

বিক্ষোভ সমাবেশে কর্মসূচি ঘোষণা করে আহতরা বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয় থেকে ঘোষণা অথবা সিদ্ধান্ত আসতে হবে। এই সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি না এলে সারা দেশ থেকে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। যতদিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা না হবে শহীদ মিনারে তাদের সেই অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

তারা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার দেয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টাসহ সব উপদেষ্টার অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। কেউ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে তাহলে তার ক্ষমতা থাকবে না। কোনো রাজনৈতিক দল যদি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে তাদেরও আওয়ামী লীগের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে।

আ’লীগ দুই লাখ খুন করতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না : ছাত্র অধিকার পরিষদ

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ। গতকাল বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ মিছিল করে তারা। এ সময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের নিন্দা জানানো হয়। সমাবেশে ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে খুন করতে পারে সেই আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার জন্য দুই লাখেরও বেশি বিপ্লবী ভাই-বোনদের খুন করতে, ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করতে ন্যূনতম কুণ্ঠাবোধ করবে না।

তিনি আরো বলেন, বিপ্লবী ছাত্র-জনতা যারা দিল্লি না ঢাকা সে্লাগান দিয়ে এই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, প্রশাসন লীগের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দিয়ে রাজপথে লড়াই করেছিল তারা এই বক্তব্য (উপদেষ্টার বক্তব্য) প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এর নিন্দা জানাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নাই আপনার! তাহলে কিসের পরিকল্পনা আছে আপনার। এই রক্ত এবং জীবনের বিনিময়ে আপনারা সেখানে বসেছেন। দিল্লির নির্দেশে আগামীতে এই দেশে নির্বাচন হবে সেজন্য কি আপনাদের এখানে বসানো হয়েছিল।

ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা গুম-খুন করে গেছে তার পরেও কিভাবে আপনারা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছে, বাংলাদেশের বিজয় নাকি ইন্ডিয়ার বিজয়। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী থেকে শুরু করে এর তৃণমূল পর্যায়ের কোনো নেতাকর্মীকে দেখেছেন এর প্রতিবাদ করতে; দেখেন নাই। তারা প্রতিবাদ করে নাই। তার মানে তারা বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে ধারণ করে না। সুতরাং এই বাংলার মাটিতে তাদের বাংলাদেশের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নাই।

বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, একটা গোষ্ঠী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দিচ্ছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বলবো আপনাদের যদি কেউ অন্ধকারে ঢিল মারতে বলে আপনারা ঢিল মারবেন না। কারণ অন্ধকারে ঢিল মেরে অনেকে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাচ্ছে। আমরা দেখেছি যে একজন সমন্বয়ক নেতা সরাসরি স্ট্যাটাস দিয়েছে। আমি বাংলার কোটি কোটি মানুষের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই আপনারা দেখেছেন এ রকম কোনো বৈঠক হয়েছে। কোনো প্রমাণ আছে। তাহলে কেন আমরা সেটার উপরে বিশ্বাস রাখব। কারো পোস্টকে কেন্দ্র করে দেশের জনগণকে অন্ধকারে ঢিল মারতে বলা হলে আর সেন্সেটিভ একটা জায়গা ক্যান্টনমেন্ট সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উসকে দেয়া হলে আমরা সেটাকে সমর্থন করতে পারি না।

বাংলাদেশের ক্রান্তিলগ্নে যেভাবে সেনাবাহিনী দেশ ও জনগণের পক্ষে ছিলেন বর্তমান সময় এবং ভবিষ্যতেও আমরা বিপ্লবী সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা জনগণের পক্ষে থাকবেন। গণহত্যাকারীদের পক্ষ আপনারা নিবেন না। রাজনীতি কারা করবে, নির্বাচন কারা করবে, নির্বাচন কবে হবে এগুলো ঠিক করার দায়িত্ব ক্যান্টনমেন্টের নয়। যদিও আমরা ক্যান্টনমেন্টের কোনো প্রতিনিধির কাছ থেকে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এ রকম কোনো বক্তব্য পাই নাই। সুতরাং কেন আমরা তাদের দিকে আঙুল তুলবো।

জুলাই গণহত্যার দ্রুত বিচার দাবি বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের : জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যার বিচারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় সংগঠনটি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মুহাম্মদ প্রিন্স, কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আকিব হাসান, কেন্দ্রীয় যুগ্ম প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক ফারজানা মিতু, সহকারী আহ্বায়ক সাইফুল্লাহ জিহাদ, প্রচার সম্পাদক রাশেদুল ইসলামসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আকিব হাসান বলেন, গত বছর জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের সাথে বৈঠকের সময় আমরা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছি। তখন বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং তাদের স্বৈরাচারী নীতির অধীনে ছাত্র-জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই গণহত্যায় অনেক নিরপরাধ ছাত্র-জনতা নিহত হয়েছেন। যেটির বিস্তারিত বিবরণ জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ছাত্রপক্ষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, এই দেশের মাটিতে আর কোনো স্বৈরাচারের ঠাঁই হবে না। কেউ স্বৈরাচার হতে চাইলে ছাত্র-জনতা তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।

সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় যুগ্ম প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক ফারজানা মিতু বলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগের শাসনে বিরোধী মতাবলম্বী এবং ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের ওপর চলমান গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিডিআর-শাপলা-জুলাই গণহত্যার বিচার দাবি করে আমরা জাতিসঙ্ঘের কাছে একটি শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। গত ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে এই ধরনের অমানবিক কার্যকলাপ চলছে। যেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্রের প্রতি পরিপন্থী।