৭৪ বছর বয়সে রিকশার প্যাডেলে জীবন টানছেন মকবুল

Printed Edition
bangla-5
৭৪ বছর বয়সে রিকশার প্যাডেলে জীবন টানছেন মকবুল

আমিনুল হক ফুলছড়ি (গাইবান্ধা)

বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও জীবনের সংগ্রাম থেমে নেই। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার রাস্তায় প্রতিদিন রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৭৪ বছর বয়সী মকবুল হোসেন। কুঁচকে যাওয়া মুখ আর ক্লান্ত চোখে ভর করেও তিনি লড়ে যাচ্ছেন বেঁচে থাকার তাগিদে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তার এই সংগ্রাম যেন সমাজের এক নীরব বাস্তবচিত্র।

ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের কেতকিরহাট এলাকার মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে মকবুল হোসেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী। ১৯৭০ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা নিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়ার। কিন্তু আশির দশকে ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে ভিটেমাটি ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে তার পরিবার। নদীতে বিলীন হয়ে যায় জীবনের সব অর্জন।

ভিটে হারিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি আশ্রয় নেন উদাখালী ইউনিয়নের পূর্ব ছালুয়া গ্রামে। সেখানে কোনো স্থায়ী কাজ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে রিকশা চালানো শুরু করেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শক্তি কমেছে, তবু পেটের দায়ে প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হয় তাকে।

দিনের বেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপটে যাত্রী মেলে না। তাই সন্ধ্যা নামলেই তাকে দেখা যায় কালিরবাজার বটতলা এলাকায়। রাতের অন্ধকারে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে চলে জীবন। অভাবের পাশাপাশি তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে একাকিত্ব। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের সবাই বিবাহিত। জীবিকার প্রয়োজনে ছেলেরা এলাকার বাইরে থাকেন। স্ত্রী মনোয়ার বেগম দুই বছর আগে প্যারালাইসে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে বড় মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

নিভে আসা চোখে মকবুল হোসেন বলেন, শিক্ষা ছিল, স্বপ্ন ছিল। কিন্তু নদী সব কেড়ে নিয়েছে। ভিক্ষা করতে পারি না, তাই এই বয়সেও রিকশা চালাই। শিক্ষা মানুষকে আলোকতি করে ঠিকই; কিন্তু ভাগ্য সবসময় বদলায় না। স্থানীয়রা জানান, তার জীবন কাহিনী শুনলে মন ভারী হয়ে ওঠে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে সামান্য সহায়তা পেলে শেষ বয়সে একটু স্বস্তি পেতেন এই বৃদ্ধ। মকবুল হোসেনের জীবন কেবল একজন রিকশাচালকের গল্প নয়; এটি নদীতে সর্বস্ব হারানো মানুষের নীরব আর্তনাদ।