বঙ্গভবন নিয়ে কিছু ভাবনা : তাইফুর রহমান
Printed Edition
বঙ্গভবন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও দাফতরিক কার্যালয়, যা রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রে অবস্থিত। স্থাপনাটি ১০০ বছরেরও অধিক ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি ভাইসরয়ের অস্থায়ী আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর প্রাসাদটি পূর্ববঙ্গ ও আসামের গভর্নর জেনারেলের বাসস্থান হিসেবে গড়ে তোলা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এটি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হাউজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রাসাদটির নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গভবন’ এবং এটিকে রাষ্ট্রপতির সরকারি আবাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বঙ্গভবনের স্থাপত্যশৈলীতে ভিক্টোরিয়ান নকশার সাথে ইসলামী ও বাংলাদেশী স্থাপত্যের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। তিন তলা বিশিষ্ট ভবনের চারপাশে লম্বা প্রাচীর, বিস্তৃত সবুজ প্রাঙ্গণ ও বৃক্ষরাজি এর সৌন্দর্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। নিচতলায় রয়েছে রাষ্ট্রপতির দফতর, সামরিক-বেসামরিক সচিবালয় ও বৈঠকের জন্য পৃথক কক্ষ। দ্বিতীয় তলায় রাষ্ট্রপতির আবাসিক অংশসহ অফিস কক্ষ ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ রয়েছে। তৃতীয় তলা উচ্চপদস্থ অতিথি ও কূটনীতিকদের জন্য নির্ধারিত। পুরো এলাকাজুড়ে রয়েছে নিরাপত্তা অবকাঠামো, ডাকঘর, ব্যাংক, ক্যান্টিন, দর্জিখানা, তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ এবং রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা রেজিমেন্টের ব্যারাক। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে আলাদা আবাসিক কোয়ার্টার।
রাষ্ট্রপতির দাফতরিক, সাংবিধানিক ও কূটনৈতিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে বঙ্গভবন বাংলাদেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানে এর প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিদেশী কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীদের সাথে বৈঠক, সম্মেলন ও রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজনের মাধ্যমে বঙ্গভবন দেশের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে। ঐতিহ্য, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আধুনিক প্রশাসনের সমন্বয়ে বঙ্গভবন আজ বাংলাদেশের সার্বভৌম পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক।
ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে অবস্থিত রয়েছে বঙ্গভবন। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্ম সম্পাদনের উচ্চ ঘনত্বের এমন এলাকায় রাষ্ট্রপ্রধানের নিবাস ও অফিস থাকা সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে কতখানি যুক্তিসঙ্গত তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। বঙ্গভবন ঢাকা শহরের একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় পার্শ্ববর্তী রাস্তায় যানজট সমস্যা অত্যন্ত গুরুতর। এখানে ব্যাংক ও করপোরেট অফিসের হাব হওয়ায় এই সমস্যাটি দিনদিন বাড়ছে, যা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতকে বিঘিœত করে। রাষ্ট্রপ্রধানের বাসভবনের আশপাশে নিরাপত্তার কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, বাণিজ্যিক অফিসগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট অ্যাক্সেস কমে যায়।
বাণিজ্যিক এলাকার ভিড় ও জনসংখ্যার কারণে রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও দুষ্কর হয়। নিরাপত্তার কারণে রুট বন্ধসহ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বাড়ে। ফলে বাণিজ্য ব্যাহত হয়। বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থানের ফলে প্রায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভের জন্য প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। ঘনবসতি ও ব্যবসায়িক কার্যকলাপে পরিবেশ দূষণ ও গোলযোগ হয়, যা রাষ্ট্রীয় প্রধানের বাসস্থলের মর্যাদাহানি ঘটায়।
এ অবস্থা নিরসনের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রধানের বাসস্থানের জন্য ঢাকা শহরের বাইরে বা শহরের শান্ত অংশ থেকে নিরাপদ এলাকা নির্বাচন করা যেতে পারে, যেখানে উচ্চমানের নিরাপত্তা বজায় রাখার উপকরণ থাকবে, পাশাপাশি আধুনিক প্রশাসনিক সুবিধা থাকবে। উন্নত নগর ব্যবস্থাপনায় অফিস ও ব্যবসার স্থান ভিন্ন রাখা হয় যাতে উভয়ের কার্যক্রম বিঘিœত না হয়। নতুন স্থানান্তরের মাধ্যমে ব্যবসায়িক এলাকার যানজট হ্রাস পাবে, যা জনসাধারণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য উপকারী হবে। বাণিজ্যিক এলাকা থেকে বঙ্গভবন স্থানান্তরের ফলে ঢাকার প্রধান ব্যবসায়িক স্থানগুলো যানজটমুক্ত ও দ্রুতগামী হবে। একান্ত প্রশাসনিক কাজ চালানোর জন্য শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত হবে, যা রাষ্ট্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। পরিবেশগত চাপ হ্রাস পাবে এবং নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। নতুন এলাকায় ব্যবসার জন্য আরো জায়গা পাওয়া যাবে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই পদক্ষেপ দেশের সার্বিক উন্নতি ও কার্যকর প্রশাসনের জন্য এক যুগান্তকারী উদ্যোগ হবে। বঙ্গভবনকে অন্যত্র সরানোর প্রশ্নে বিশ্বের অনেক দেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো পরিকল্পিত রাজধানী গড়ে প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়িয়েছে, ভৌগোলিক ভারসাম্য এনেছে এবং নিরাপত্তা ও অবকাঠামো আধুনিকীকরণে সফল হয়েছে। ব্রাসিলিয়া বা ক্যানবেরা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা হচ্ছে সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনঅংশগ্রহণ থাকলে নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র টেকসই হতে পারে। ধাপে ধাপে স্থানান্তর প্রক্রিয়া পুরনো শহরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অটুট রেখেও নতুন শহরকে প্রশাসনিক কেন্দ্র করে তোলা যায়। বিপরীতে, নেইপিদোর মতো হঠাৎ সিদ্ধান্তে গড়া রাজধানীতে নাগরিক জীবন, ব্যবহারযোগ্যতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি দেখা দেবে।
উন্নত দেশগুলোতে রাষ্ট্র প্রধানের বাসভবন সাধারণত শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র থেকে দূরে, শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ এলাকায় থাকে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজ ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি সবুজ ও শান্ত এলাকাজুড়ে অবস্থিত। যুক্তরাজ্যের ব্লেয়ার হাউজ কিংবা বার্লিনের রাষ্ট্রীয় বাসভবনগুলোও সাধারণত ব্যবসায়িক জোন থেকে আলাদা থাকে। যেন নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম নির্বিঘেœ অনুষ্ঠিত হয়। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় প্রধানের বাসস্থানের জন্য বাণিজ্যিক এলাকা আদর্শ নয়, কারণ এটি ব্যবসায় ও জনজীবনের সাথে অসঙ্গতি ঘটায় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক মূল্য, নিরাপত্তা, ঢাকার উচ্চ জনঘনত্ব, ট্রাফিক চাপ এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ বেছে নেয়া জরুরি। সম্পূর্ণ স্থানান্তরের বদলে ‘হাইব্রিড মডেল’ অর্থাৎ- বঙ্গভবনে আনুষ্ঠানিক কার্যাবলি রেখে প্রশাসনিক কাজ পরিকল্পিত নতুন জোনে সরানো একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। এতে ঐতিহ্য রক্ষা, জনঅংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা বজায় থাকে, এক সাথে আধুনিক প্রশাসনিক পরিবেশও তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো বিবেচনায় নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশও প্রতীকী মূল্য ধরে রেখে আরো কার্যকর রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর দিকে এগোতে পারে।
করপোরেট হেডকোয়ার্টার, ব্যাংক এবং ট্রান্সপোর্ট কেন্দ্র হিসেবে মতিঝিল এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে যদি রাষ্ট্রপ্রধানের বাসভবন ও অফিস সেই একই এলাকায় থেকে যায়, তাহলে সে এলাকা কর্তৃত্ব, নিরাপত্তা, জনগণের চলাচল, নগর পরিবহন ও বাণিজ্যিক গতিশীলতা একসাথে সংযুক্ত হয়ে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সময় এসেছে এ বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় আনা এবং একসাথে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে মনোযোগ দেয়া। দেশের সার্বিক উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে যা সর্বাধিক যুক্তিসঙ্গত।
লেখক : ব্যাংকার