দাউদ আবদেল সাঈদ
সিনেমার কথক ও এক বিদ্রোহী জাদুকরের গল্প
Printed Edition
সাকিবুল হাসান
গল্প বলার চিরাচরিত ঢঙ ভেঙে যিনি সেলুলয়েডে বুনেছেন প্রতিবাদের নতুন ভাষা, তিনি দাউদ আবদেল সাঈদ। বিশ্ব সিনেমার মানচিত্রে মিসরীয় এই নির্মাতার নাম উচ্চারিত হয় এক ‘বিদ্রোহী জাদুকর’ হিসেবে। তার সিনেমা মানেই কেবল দৃশ্যপট নয়; বরং এক অদৃশ্য কথকের জবানবন্দিতে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা সত্যের উন্মোচন।
সভ্যতার শুরুতে গল্পের কথক বা ‘রাবি’ ছিলেন একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী অধিপতি। তার বর্ণনায় থাকত শাসনের সুর। দাউদ আবদেল সাঈদ তার নির্মাণে এই প্রাচীন ‘কথক’ সত্তাকেই ফিরিয়ে এনেছেন, তবে সম্পূর্ণ নতুনরূপে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একটি কণ্ঠস্বর একই সাথে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ ও উপহাস করতে পারে।
১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম তথ্যচিত্র ‘একজন জ্ঞানী ব্যক্তির অসিয়ত’। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ মনে হলেও এর গভীরে ছিল তীব্র শ্লেষ। সিনেমার নেপথ্য কণ্ঠটি যখন বলে, ‘কৃষকের সন্তানদের পড়াশোনা করা একটি মহামারী’ তখন দর্শক বুঝতে পারে পরিচালক আসলে জ্ঞান দেয়ার ছলে বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্কীর্ণতাকে বিদ্রƒপ করছেন। এটিই ছিল দাউদের সিগনেচার স্টাইল যেখানে তিনি কথককে ব্যবহার করেছেন প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক হাতিয়ার হিসেবে।
দাউদ আবদেল সাঈদের প্রতিটি সিনেমা যেন সমাজতত্ত্বের একেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় : কিত কাত (১৯৯১) : শেখ হুসনির জবানিতে তিনি দেখিয়েছেন, শারীরিক অন্ধত্বের চেয়ে মনের অন্ধত্ব কত বেশি ভয়ানক। এটি কেবল একটি পাড়ার গল্প নয়; বরং এক স্থবির হয়ে যাওয়া সমাজের প্রতিচ্ছবি। আর্দ আল-খওফ (২০০০) : এখানে পুলিশের রিপোর্টই হয়ে ওঠে গল্পের প্রধান ভাষ্য। জীবনের ২০টি বছর বিলীন হয়ে যাওয়ার পর সত্য আর মিথ্যার যে দ্বন্দ্ব, তা এই সিনেমায় এক অনন্য উচ্চতা পেয়েছে। মুওয়াতিন ওয়া মুখবির ওয়া হারামাই (২০০১) : একজন লেখক, একজন গোয়েন্দা আর একজন চোর- এই তিনের রসায়নে দাউদ মিসরীয় সমাজ কাঠামোর ব্যবচ্ছেদ করেছেন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে।
তার ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত ঘটনা কিংবদন্তি অভিনেত্রী ফাতেন হামামার সাথে ‘আর্দ আল-আহলাম’ (স্বপ্নভূমি) চলচ্চিত্রে কাজ করা। এটি ছিল দুই ভিন্ন জগতের মিলন। একদিকে চিরাচরিত তারকা ভাবমর্যাদা, অন্যদিকে দাউদের আপসহীন পরিচালনা। যদিও এই অভিজ্ঞতার পর তারা আর কখনো একসাথে কাজ করেননি; কিন্তু চলচ্চিত্র ইতিহাসে এই ‘অসম্পূর্ণ হাহাকার’ এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।
২০১৫ সালে তার ‘এক্সট্রা-অর্ডিনারি অ্যাবিলিটিজ’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি আবারো প্রমাণ করেন; ব্যক্তি যখন তার গণ্ডির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন সঙ্ঘাত অনিবার্য। দাউদ আবদেল সাঈদ কেবল সিনেমার পরিচালক নন, তিনি একজন সমাজ-গবেষকও। তার জাদুকরি ছোঁয়ায় সিনেমার পর্দার সাধারণ কথাগুলোই হয়ে ওঠে এক শক্তিশালী বিদ্রোহের আখ্যান।