আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হচ্ছে দেউলিয়া আইন
Printed Edition
আশরাফুল ইসলাম
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও করপোরেট খাত দীর্ঘ দিন ধরেই একটি কাঠামোগত সঙ্কটে আটকে আছে। খেলাপি ঋণের পাহাড়, অকার্যকর কোম্পানির কাগুজে অস্তিত্ব, বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকা দেনা-পাওনার মামলা সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের আইনি অচলাবস্থা। এ অচলাবস্থা কাটাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা হচ্ছে দেউলিয়া আইন। এ আইনের আওতায় সহজেই লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়ন করা যাবে। আইনকে নতুন রূপে সাজাতে ইতোমধ্যে এর খসড়ার ওপর জনমতামত নেয়া হয়েছে। এসব মতামত পর্যালোচনা করা যাচ্ছে। শিগগিরই খসড়া চূড়ান্ত করে আইন প্রণয়ন করা হবে। এই প্রেক্ষাপটে ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ নামক একটি নতুন আইন জারি করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
কেন এই আইন প্রয়োজন হলো : বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত দেউলিয়াত্ব সংক্রান্ত আইনগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও কোম্পানি আইন, কোথাও দেওয়ানি কার্যবিধি, কোথাও ব্যাংক কোম্পানি আইন। ফলে কোনো ব্যবসা বা ব্যক্তি আর্থিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে তার জন্য একটি সমন্বিত আইনি পথ ছিল না। এই সুযোগেই বড় খেলাপিরা বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে গেছে, ব্যাংকের টাকা আটকে রেখেছে, অথচ তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পুনর্গঠন বা লিকুইডেশনের উদ্যোগ নেয়া যায়নি। নতুন অর্ডিন্যান্সটি সেই শূন্যস্থান পূরণের দাবি করছে।
আইনের মূল দর্শন : শাস্তি নয়, পুনরুদ্ধার এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এটি দেউলিয়াত্বকে অপরাধ হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ধারা ২ অনুযায়ী, আইনটির লক্ষ্য শুধু দেনা আদায় নয় বরং টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকা ব্যবসাকে পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন রক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত ঋণদাতাদের জন্য সর্বোচ্চ আদায় নিশ্চিত করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর ইনসলভেন্সি আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইনসলভেন্সি প্রফেশনাল : শক্তি না দুর্বলতা?
খসড়া আইনের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ইনসলভেন্সি প্রফেশনাল। আদালত নিযুক্ত এই ব্যক্তি পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে, সম্পদ চিহ্নিতকরণ, দাবির তালিকা প্রস্তুত, সম্পদ বিক্রি ও বণ্টন পর্যন্ত। তবে এখানেই বড় প্রশ্ন উঠছে-বাংলাদেশে কি এখনই এমন দক্ষ, নিরপেক্ষ ও স্বার্থমুক্ত ইনসলভেন্সি প্রফেশনাল তৈরির অবকাঠামো আছে? আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বা করপোরেট প্রভাব ঢুকে পড়ে, তাহলে এই পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
বড় খেলাপিদের জন্য আশ্রয়স্থল?
খসড়া আইনের আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো রিঅর্গানাইজেশন বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। তাত্ত্বিকভাবে এটি ভালো উদ্যোগ হলেও বাস্তবে এটি বড় খেলাপিদের জন্য সময় ক্ষেপণের কৌশলে পরিণত হতে পারে কিনা, সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে বারবার রিঅর্গানাইজেশনের সুযোগ, সম্পদ গোপন বা স্থানান্তরের ঝুঁকি, এবং প্রভাবশালী দেনাদারদের চাপ এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি না থাকলে আইনটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
ব্যক্তি দেউলিয়াত্ব : নতুন দিগন্ত
খসড়া আইনের একটি ইতিবাচক দিক হলো ব্যক্তিগত ব্যাংকরাপ্সি অন্তর্ভুক্ত করা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা সাধারণ নাগরিক, যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণচাপে পড়েছেন, তারা নির্দিষ্ট শর্তে দায়মুক্তির সুযোগ পাবেন। একই সাথে ‘ঊীপষঁফবফ অংংবঃ’ ধারণার মাধ্যমে ন্যূনতম জীবনযাত্রার সুরক্ষাও রাখা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই সুযোগ অপব্যবহার করে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণে শক্ত বিধান প্রয়োজন।
আদালতের সক্ষমতা : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
খসড়া আইন কার্যকর করতে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে আদালতের সক্ষমতা। জেলা জজ আদালতকে ইনসলভেন্সি কোর্ট হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও বিচারকের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর কেস ম্যানেজমেন্ট। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে আইনটি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারে একটি সাহসী পদক্ষেপ। এটি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা উদ্ধার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির সম্ভাবনা রাখে। তবে আইনটির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর, বিশেষ করে ইনসলভেন্সি প্রফেশনালের নিরপেক্ষতা, আদালতের দক্ষতা এবং বড় খেলাপিদের জন্য শূন্য সহনশীল নীতির ওপর। এই আইন সত্যিই যদি প্রয়োগের সাহস দেখাতে পারে, তাহলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের খেলাপি অর্থনীতির দীর্ঘদিনের চিকিৎসা। অন্যথায়, এটি আরেকটি ভালো আইনের ব্যর্থ বাস্তবায়নের উদাহরণ হয়েই থাকবে।