কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে চায় জামায়াত
Printed Edition
খালিদ সাইফুল্লাহ
জাতীয় সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সংসদে নাগরিক সমস্যা তুলে ধরবে দলটি। একইসাথে রাজপথে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন সংগ্রামেও সক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
অনেক আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত নিজেদের ৬৮ আসনের পাশাপাশি জোটগতভাবে ৭৭ আসন নিয়ে জাতীয় সংসদে যাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আগামী ১২ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম। এবারই প্রথম বড় পরিসরে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে দলটি। জামায়াতের নির্বাচিত এমপিদের মধ্যে পুরাতন ও নতুনের মিশেল রয়েছে। তবে নতুন এমপিদের সংখ্যাই বেশি। সেজন্য এসব এমপিকে নিয়ে সম্প্রতি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে দলটি। মূলত সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে চায় জামায়াত। তবে দলটির সূত্রে জানা গেছে, বিগত সময়ের বিরোধী দলগুলোর চেয়ে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায় জামায়াত। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করতে চায় না দলটি। নেতারা বলছেন, জামায়াত তাদের শৃঙ্খলাভিত্তিক দলের যে ভাবমর্যাদা সেটা ধরে রাখতে চায় এবং আগামীতে সরকার গঠনের প্রস্তুতিও সেরে রাখতে চায় এ সংসদে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে।
জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়লাভ করেছে। এর আলোকে বিরোধী দল জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে একটি শপথের পাশাপাশি গণপরিষদের সদস্য হিসেবেও আরেকটি শপথ নিয়েছে। তবে বিএনপি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। এ জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে জাতীয় সংসদে এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ অবস্থায়ও জামায়াত সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মনির। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে সংসদে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথেও আমরা সক্রিয় থাকব। জুলাই সনদ নিয়ে যেভাবে রিট হয়েছে সংসদ নির্বাচন নিয়েও যে কেউ রিট করার আশঙ্কা থেকে যায় বলে তিনি মনে করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হলেও অনেক কষ্ট বুকে চেপে নির্বাচনের ফল আপাতত মেনে নিয়েছি। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের অন্যায় মেনে নেয়া হবে। অন্যায় হলে আইনিভাবে, সংসদে এবং রাজপথে লড়াই করা হবে। জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৬৯ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। সেই জনরায়কে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো পুরো জুলাই আন্দোলনকেই অস্বীকার করা। জুলাইয়ের আন্দোলন না থাকলে আজকের জাতীয় সংসদও থাকত না, এমনকি অনেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগও সৃষ্টি হতো না। যে চুক্তিতে বিএনপি স্বাক্ষর করেছে সেটি মেনে নিলে জনগণের আস্থা বজায় থাকবে। অন্যথায় জনগণ আস্থা হারালে নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নিতে বাধ্য হবে। তিনি বলেন, সরকার যদি জনগণের অনুভূতি ধারণ করে দেশ পরিচালনা করে, তাহলে জামায়াতে ইসলামী সহযোগিতা করবে। অন্যথায় অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেয়। যারা বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের সাথে ক্ষমতার লড়াই করেছে। ফলাফলে বিএনপি জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করলেও প্রতিটি আসনেই সমানতালে লড়াই করেছে জামায়াত জোট। বিএনপির ২১২ আসনের বিপরীতে মাত্র ৭৭ আসন পেলেও ভোটের সংখ্যায় তারা যথেষ্ট প্রতিযোগিতা করেছে। নির্বাচন কমিশনের দেয়া তথ্য মতে, প্রদত্ত প্রায় সাত কোটি ভোটের মধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট। আর জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট। প্রায় দুই কোটি ৮৮ লাখ নাগরিক এই জোটের ওপর তাদের আস্থা রেখেছেন। এটি একটি বিশাল ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জনরায় হিসেবে মনে করছে জামায়াত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অতীতের অনেক রেকর্ড ভঙ্গ করে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০০৮ সালে মাত্র দু’টি আসন থেকে এবার প্রায় তিন কোটি মানুষের সমর্থন জামায়াতের প্রতিজন আস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।