সাক্ষাৎকার : অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ আকরাম হোসেন
বিএমইউকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে প্রয়োজন পেশাদার নেতৃত্ব
Printed Edition
মেধাভিত্তিক সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ নিয়োগ ও পেশাদার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষা, গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল সেবার পরিবেশ আরো শক্তিশালী হবে। পেশাদার নেতৃত্বে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক মানের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে পারবে বলে মনে করেন বিশিষ্ট মেডিক্যাল শিক্ষাবিদ, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনের সদস্য বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: সৈয়দ মুহাম্মদ আকরাম হোসেন। তার রয়েছে ১২৬টি গবেষণা প্রকাশনা, জনস্বাস্থ্য ও ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে উচ্চতর ডিগ্রি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা হামিম উল কবির।
নয়া দিগন্ত : বিএমইউকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতের জন্য হলে কী কী করতে হবে বলে আপনি মনে করেন?
অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ আকরাম হোসেন : এই বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে হলে আগে সৎ আত্মসমালোচনা জরুরি। অতীতের অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। এরপর থাকতে হবে নিয়োগে স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ এড়াতে দরকার উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ, কাঠামোবদ্ধ স্কোরিং, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ। প্রতিষ্ঠা করতে হবে মেরিটোক্র্যাসি, পারফরম্যান্স বেজড প্রমোশন, গবেষণা প্রণোদনা। আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে ফ্যাকাল্টি অ্যাপ্রেইজাল ও অ্যাকাডেমিক অডিট চালু করতে হবে এবং আমি বলব একটি বড় মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হলে মেধাই হবে অগ্রাধিকার। প্রকিউরমেন্টেও স্বচ্ছতা আনতে হবে। চালু করতে হবে ই-প্রকিউরমেন্ট, থার্ড-পার্টি অডিট, টেন্ডার ফলাফল প্রকাশ এবং কমপ্লায়েন্স ইউনিট নিশ্চিত করা। এ ছাড়া চিকিৎসায়ও নিরপেক্ষতা থাকতে হবে। ক্লিনিক্যাল গভার্নেন্স, পেশেন্ট রাইটস চার্টার ও স্বাধীন অভিযোগ পর্যালোচনা বোর্ড গঠন করতে হবে। জরুরি চিকিৎসা হবে প্রোটোকলভিত্তিক, পক্ষপাতমুক্ত।
নয়া দিগন্ত : বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবা ও অন্যান্য কার্যক্রম কেমন হওয়া উচিত?
অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ আকরাম হোসেন : রাষ্ট্রপ্রধান থেকে সাধারণ নাগরিক সবার জন্য সমান মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে; নথিপত্র হবে স্বচ্ছ ও পর্যালোচনাযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, সুশাসন, উচ্চমানের শিক্ষা-গবেষণা ও মানবিক চিকিৎসাসেবার ওপর। অভিযোগ নয়, আস্থাই হবে আগামী দিনের পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল একটি লিভিং ল্যাবরেটরি। বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল শুধু সেবাকেন্দ্র নয় এটি হওয়া উচিত অ্যাকাডেমিক ক্লিনিকেল ল্যাবরেটরি। এখানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, জাতীয় গবেষণা সমন্বয়, রোগতত্ত্বভিত্তিক ড্যাটাবেস এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিজস্ব ক্লিনিকেল প্র্যাকটিস গাইডলাইনস প্রণয়ন হবে। বিদেশী গাইডলাইন অনুসরণ যথেষ্ট নয়; দেশীয় গবেষণাভিত্তিক প্রটোকল তৈরি করা জরুরি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন হাসপাতালকে (দু’টি) স্বায়ত্তশাসিত গভর্নিং বোর্ডের অধীনে পরিচালনা করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় নীতিগত তদারকি করবে; কিন্তু দৈনন্দিন সেবা পরিচালনা করবে পেশাদার হাসপাতাল বোর্ড। এতে শিক্ষা ও সেবা দু’টি ক্ষেত্রই শক্তিশালী হবে।
অ্যাকাডেমিক ও সার্ভিসকে সেপারেশন করতে হবে। নীতিগত সমন্বয় থাকবে; কিন্তু পরিচালনা আলাদাভাবে হবে। চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষাকে আলাদা করে পরিচালনা করা একটি আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত মডেল। বিভাগীয় ক্ষমতায়ন করে চেয়ারম্যানদের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ দিলে গবেষণা, ছোট প্রকিউরমেন্ট ও প্রশিক্ষণ দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
নয়া দিগন্ত : ভিসিই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ব্যক্তি। তার মূল ফোকাস কী হওয়া উচিত?
অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ আকরাম হোসেন : ভিসির অগ্রাধিকার থাকতে হবে শিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপারে, দৈনন্দিন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনে আরো অনেকেই আছেন তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, পেশাদার প্রশাসন ও গবেষণা-অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা গেলে আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টি দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী অ্যাকাডেমিক মেডিক্যাল সেন্টারে পরিণত হতে পারে। স্বপ্ন নয় সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারই বাস্তব পরিবর্তনের পথ। ভিসি দৈনন্দিন ফাইল স্বাক্ষর ছাড়াও নীতিনির্ধারণ, কৌশলগত পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শিক্ষা গবেষণার মানোন্নয়নে ভূমিকা পালন করবেন। দরকার ডেলিগেশন অব অথরিটি, স্তরভিত্তিক ফাইল নিষ্পত্তি, রেজিস্ট্রার অফিস পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। বিশ্ববিদ্যালয়টি মসৃণভাবে চালানোর জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। ১০০ শতাংশ ইলেকট্রনিক ফাইল (ই-ফাইল), ই-সাইন, ইআরপি ভিত্তিক এইচআর, ফাইন্যান্স প্রকিউরমেন্ট ও অনলাইন সেবা চালু করলে ফাইল জট কমে যাবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়বে। স্বাধীন ক্লিনিক্যাল গভার্নেন্স ইউনিট করে নিয়মিত ক্লিনিক্যাল অডিট, পেশেন্ট সেফটি রিভিউ ও বিভাগীয় পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য উন্নয়নমুখী (ইম্প্রুভমেন্ট ড্রিভেন) অডিট টিম প্রয়োজন। ফুল-টাইম অ্যাকাডেমিক মডেল অ্যাকাডেমিক ক্লিনিশিয়ান ট্র্যাক, গবেষণা প্রণোদনা ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক মান অর্জন সম্ভব নয়। অন্য দিকে প্রতিযোগিতামূলক বেতনকাঠামোও থাকতে হবে। উচ্চমানের শিক্ষক ধরে রাখতে উপযুক্ত বেতন ও প্রণোদনা অপরিহার্য। এটি ব্যয় নয়; বরং অ্যাকাডেমিক এক্সিলেন্স ইনভেস্টমেন্ট। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে ব্যক্তি নয়, সিস্টেম-নির্ভর কাঠামো দিয়ে ভিশন-কেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ডিজিটাল প্রশাসন, স্বচ্ছতা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
নয়া দিগন্ত : ২০২৩ সালে লন্ডনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎকালে কী আলোচনা হয়েছিল?
অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ আকরাম হোসেন : এটি আমার জন্য নিঃসন্দেহে একটি সৌভাগ্যের বিষয় ছিল যে, তিনি আমাকে সময় দিয়েছিলেন। ঘটনাটি শুরু হয় একটি চিকিৎসা প্রসঙ্গ থেকে। আমি তখন করপোরেট পর্যায়ে স্কয়ার ক্যান্সার সেন্টারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। একটি রোগী দেখার সূত্র ধরে আমাদের মধ্যে প্রথম টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপ হয়। সে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি আমাকে বলেন, আপনি যদি কখনো লন্ডনে আসেন, অবশ্যই দেখা করবেন। ২০২৩ সালের জুন মাসে লন্ডন সফরের সময় সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি আমাকে প্রায় ৪৫ মিনিট সময় দেন। সেই বৈঠকে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আমাদের বিস্তৃত আলোচনা হয়। জনস্বাস্থ্য নীতি, ক্যান্সার চিকিৎসা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বাজেট বৃদ্ধি, প্রশাসনিক সংস্কার, বিকেন্দ্রীকরণ, গবেষণা সক্ষমতাসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে প্রশ্ন করেন। আমার কাছে যেটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল সেটি হলো- তিনি বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি পড়াশোনা করেছেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে শুনেছেন এবং স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলো বুঝতে চেষ্টা করেছেন। তিনি যে প্রশ্নগুলো করেছিলেন, তা ছিল বিশ্লেষণধর্মী ও নীতিগত। আলোচনায় আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি ছিল যে, তিনি একটি জিরো-টলারেন্সভিত্তিক মেডিক্যাল প্রশাসন মডেল নিয়ে চিন্তা করছেন। একটি দুর্নীতিমুক্ত মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিভাবে গড়ে তোলা যায় সেই রূপরেখা নিয়ে তার আগ্রহ স্পষ্ট ছিল।
নয়া দিগন্ত : চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা রোধে কী করা প্রয়োজন?
অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ আকরাম হোসেন : আমি বিশ্বাস করি যদি স্বাস্থ্য খাত সংস্কার সত্যিকার অর্থে অগ্রাধিকার পায়, তবে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ টাকা চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যায়। আমরা যদি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণা ও সেবা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে এই অর্থ দেশের মধ্যেই বিনিয়োগ হবে এবং রোগীদের বিদেশমুখী প্রবণতা কমে যাবে।