কালির চরে পাখির মেলা

Printed Edition
Back-5
কালির চরের সাগর পাড়ে খাবার সংগ্রহে ব্যস্ত পাখি : নয়া দিগন্ত

রফিকুল হায়দার ফরহাদ, কালির চর, ভোলা থেকে ফিরে

‘বাহ! খালের পাড়ে ছোট একটি সবুজ সমতল ভূমি। এরপর সাদা বাদি। পরেই সবুজ বন। কী চমৎকার! ভাই, এই চরের নাম কী।’ ২০২২ সালে প্রথম যখন চর কুকরি মুকরিতে গিয়েছিলাম তখন সাথে থাকা মাঝি আলী বক্স, সেলিম মাঝি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী রাসেলকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম পাশেই থাকা চরটি সম্পর্কে। তখন তাদের উত্তর ছিল এই চরের নাম কালির চর। সেই সময়ে এই চরে পর্যটকদের যাওয়া-আসা ছিল। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটি এনজিরও উদ্যোগে টয়লেট ও টিউবওয়েলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ ছাড়া বসার জন্য বেঞ্চ, মাঙ্কি জাম্পিংয়ের নেটসহ আরো ব্যবস্থা ছিল। সেই চরে টিউবওয়েলের ধারে আমি একটি নারিকেল গাছ লাগিয়েছিলাম। যেমন একটি করে নারিকেল চারা লাগিয়েছিলাম চর কুকরি মুকরির নারিকেল বাগান ও তারুয়ার চরে। তবে কুকরি মুকরির মতো কালির চরের গাছটিও বাঁচেনি। কালির চরের নারিকেল চারা মহিষে খেয়ে ফেলেছিল। তা বেড়া ভেঙে। আর কুকরি মুকরির নারিকেল চারা মরে গেছে যতেœর অভাবে। এবার সেই কালির চরে গিয়ে হতাশা আরো বেড়ে গেল। নেই সেই টিউবওয়েলের অস্তিত্ব। শুধু পাকা করা কলপাড়ই আছে। আর টয়লেটের স্টিলের দরজা পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে। পর্যটকদের জন্য বাকি সুযোগ-সুবিধাগুলোও নেই। মাঙ্কি জাম্পিংয়ের সেই বিশাল নেট পাওয়া গেল টয়লেটের পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায়। অর্থাৎ পর্যটকদের জন্য কোনো কিছুই নেই সেখানে। অথচ কুকরি মুকরিতে পর্যটকদের চাপ কমাতে পাশে থাকা কালির চরকে পর্যটক বান্ধব করা হয়েছিল।

কুকরি মুকরির নারিকেল বাগানে পর্যটকরা ক্যাম্প করে থাকেন। হোসেন মাঝি জানান, আগে এই কালির চরেও ভ্রমণপিপাসুরা ক্যাম্প করে থাকত। কারণ পাশেই ছিল টয়লেট ও টিউবওয়েল। এ ছাড়া কুকরি মুকরিতে পর্যটকদের চাপ বেশি থাকলে নিরিবিলিতে থাকার জন্য কিছু পর্যটক বেছে নিতেন এই কালির চরকে। তবে এগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন আর প্রকৃতিপ্রেমীরা সেখানে যান না। কারণ খাবার ও ব্যবহারের পানি টানাটা খুবই কষ্ট কর।

হোসেন মাঝির দেয়া তথ্য, ৪০ বছর আগে এই চর জেগে উঠে। আর গাছ লাগানো শুরু প্রায় ৩৫ বছর হলো। কেন এই চরের নাম দেয়া হয়েছে কালির চর। হোসেন মাঝির মতে, শুরুর দিকে এই চরে কাইল্লা লতা বেশি জন্মাতো। তাই এই চরের নাম দেয়া হয় কালির চর। বনের এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত যেতে আমাদের ঘণ্টা খানেক লাগে। তবে জানি না কত কিলোমিটার আয়তনের এই কালির চর।’ অবশ্য মাঝি জাকির বক্স জানালেন, ছয় কিলোমিটারের মতো হবে এই চর।

ছোট্ট একটি খাল দিয়ে বিভক্ত চর কুকরি মুকরি ও কালির চর। কুকরি মুকরির খেয়া ঘাটের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ওই খাল। ভাটার সময় হালকা পানি থাকে। জোয়ারে ভরে যায়। আগে এই খালের ওপর একটি গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি সাঁকো ছিল। ২০২২ সালে এই সাঁকো পেরিয়েই আমি কালির চরে গিয়েছিলাম। তবে এখন নেই সেই সাঁকো। পয়ষট্টির চর থেকে ফিরে পড়ন্ত বিকেলে ভাটার হালকা পানিতে ছোট নৌকা নিয়ে পার হলাম কালির চর ও চর কুকরি মুকরিকে বিভক্ত করা এই খাল। সেই ভোরে চর নিজাম থেকে রওনা হয়ে এরপর দুপুরে পয়ষট্টির চর হয়ে কুকরি মুকরিতে ফিরে বিকেলে এই কালির চরে অবশ্য আমি মনের জোরেই গিয়েছিলাম। শরীর সায় না দিলেও মন বলছিল যেতে হবে। কান্ত ছিল রাতুলও। এরপরও গেলাম। কারণ এত কাছের এই চরে কেন যাব না, এই মানসিকতায়। চর পাতিলা থেকে কেনা চেউয়া মাছের শুঁটকিগুলো কুকরি মুকরির নারিকেল বাগানের পাশে তাঁবুতে রেখে রওনা হলাম কালির চরে। রাসেল-রাশেদদের তাঁবুতে রাখলাম শুঁটকিগুলো। হোসেন মাঝি আশ^স্ত করলেন, ‘এখানে কোনো কিছু চুরি হবে না।’ চুরি হয়ওনি।

আলী মাঝির ছোট নৌকায় খাল পেরিয়ে এরপর কয়েক মিনিট প্রায় অর্ধফুট গভীরতার কাদা ডিঙ্গিয়ে কালির চরের শুকনা অংশ গেলাম। সেখানে কিছু অংশে সাদা বালু। আর কিছু অংশে সবুজ ঘাস। যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল গরু ও মহিষের গোবর। তবে খালি পায়ে এই ঘাসের এলাকা পার হওয়াটা কষ্টকর। ঘাসের চিকন মাথা পায়ের পাতায় খোঁচা লাগছিল। এই অবস্থায় কিছু দূর এগিয়ে এরপর মহিষের হাঁটা পথ ধরলাম। বনের মহিষগুলো যে পথে যাতায়াত করে সেই পথে এগিয়ে সবুজ ঘাসের প্রান্তরে গেলাম। এই পথ অপেক্ষাকৃত হাঁটার জন্য সহায়ক। হালকা ভেজা মাটি। এরই মধ্যে পায়ে লেগে থাকা কাদা পরিষ্কারের জন্য সাথে থাকা মাঝি রাতুল নিয়ে গেলেন সাগর পাড়ে। সেখানে মরা গাছের শুকনো ডাল ফেলে মিনি ঘাট করে দিলো আমার জন্য।

পা ধুয়েই চললাম আরো দক্ষিণে। তখন পশ্চিম আকাশে সূর্য্য ডুবছে। একটু পরেই বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল শিয়ালের ডাক। রাতুল জানালো এই বনে অনেক বানরও আছে। হোসেন মাঝি আগেই তথ্য দিয়েছিলেন, ‘হরিণ আছে এই বনে।’

কাদা, বালু, চিকন দুর্বা জাতীয় শক্ত ঘাস ডিঙ্গিয়ে টিউবওয়েলের পাড়ে গেলাম। সেখানে পেলাম গেওয়া গাছের ওপর বেয়ে বেয়ে বড় হওয়া লতা জাতীয় একটি গাছ। আঙ্গুরের মতো ফল ধরে আছে। গাছের পাতাগুলোও আঙ্গুর গাছের পাতার মতো। এমনই একটি গাছ আমি দেখেছিলাম পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চর মোন্তাজের এক খালের পাড়ে। এই ফল পাকলে পাকা জামের মতো কালো রঙ ধারণ করে। তবে জামের মতো লম্বাটে নয়। ফলটি গোলাকৃতির হয়। টক জাতীয় ফল। স্থানীয়রা লবণ মরিচ দিয়ে বানিয়ে খায় এই ফল। চর মোন্তাজের মানুষের মতো চর কুকরি মুকরির মানুষও এই ফলকে বলে মুরমুইরা। আমরা অবশ্য ফলগুলোকে কাঁচা অবস্থায় পেলাম।

তবে ২০২২ সালে সাগরপাড়ে যে গাছগুলো দেখেছিলাম এবার সেই গাছগুলো নেই। তিনটি মাত্র গাছ দাঁড়িয়ে আছে। বাকিগুলো ভাঙ্গনে বিলীন। গাছের গুঁড়িগুলো আছে সাক্ষী হিসেবে। আগের বার সেই গাছে বকের চেয়ে বড় পাখি দেখেছিলাম। ঠোঁটগুলো কালো। হালকা বাঁকা। স্থানীয়রা এই পাখিকে ঘোঙ্গর পাখি বলে। এবার গাছও নেই। পাখিও নেই। অবশ্য কাদা ডিঙ্গানো এলাকায় বকের সাথে কয়েকটি ঘোঙ্গর পাখিকে মাটি থেকে খাবার সংগ্রহে দেখেছি। সাথে থাকা উঠতি মাঝি রাতুল জানালো সে এই বন থেকে বেশ কয়েকটি টিয়া পাখির বাচ্চা ধরেছিল। পরে তা তার এক বন্ধুকে দিয়ে দেয়। ক্রমেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় আমরা দ্রুত চলে এলাম কালির চর থেকে। সরু খালের পাড় থেকে আলী মাঝিও ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছিলেন। সেই সাথে রাতুলেরও টেনশন। সে ঘাটে যে ট্রলারটি রেখে এসেছে তা তারুয়ার চর থেকে আসা লঞ্চের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

পরের দিন আবার যে এই কালির চরে যাওয়া হবে তা ধারণাতেই ছিল না। পাঙ্গাইশসার চরে যাওয়ার সময় এই কালির চরের পাড় ধরেই দক্ষিণে গিয়েছিল আমাদের ট্রলার। তখন এই চরের সমুদ্র সৈকত এবং চরের শেষ মাথা দেখার সুযোগ হয়েছিল। তা দেখতে বেশ সুন্দর। হোসেন মাঝি আশ^াস দিলেন পাঙ্গাইশসার চর থেকে ফেরার সময় এই বিচে তিনি আমাকে নামাবেন।

কথা দিয়ে কথা রাখেন হোসেন মাঝি। তা ছাড়া একজন পর্যটক যা চায় তা পূরণের চেষ্টা করেন তিনি। এটা তার ব্যবসায় কৌশল। ঠিকই আসার সময় আমাকে প্রথমে নিয়ে এলেন চর জমিন বা মোখলেসের চরের খুবই ছোট বিচে। ৫০ মিটারের মতো হবে এই বিচ। সেখানে নামলাম না। এরপর গেলাম কালির চরের সাগর পাড়ে। প্রথমে কালির চর ও চর জমিন বা মোখলেসের চরকে বিভক্তকারী খালের কাছে। খালের পশ্চিম পাড়ে চর জমিন বা মোখলেসের চর। পূর্বে কালির চর। কালির চরের এই অংশে আরেক সৌন্দর্য্য। দু’টি বিচ আছে এই কালির চরে। প্রথমটি কুকরি মুকরি থেকে দক্ষিণ দিকে সামনে। এটি বেশ বড়। কয়েক শ’ মিটার লম্বা হবে। আর পরেরটি চর জমিন ও কালির চরের বিভক্তকারী খালের শেষ অংশে। এটিকে বলা হয় কালির চরের শেষ মাথা। এখানকার বিচটি এক শত মিটারের মতো লম্বা। সেখানে গোলপাতা দিয়ে জেলেদের তিনটি ঘর দেখলাম। এই ঘরগুলোতে জেলেরা বিশ্রাম নেন। সাগরে বা খালে মাছ ধরার পর এই বিশ্রাম নেয়া। এক জেলে নৌকা থেকে উঠে একটি ঘরে ঢুকে গেলেন বিশ্রাম নেয়ার জন্য।

আমরা এই শেষ মাথার ছোট বিচ পেরিয়ে বড় বিচের কাছে এলাম। তবে সাদা বালুর বিচের সামনে শত শত মরা গাছের গুঁড়ি। চরকে রক্ষার জন্য এই গাছগুলো লাগানো হয়েছিল। কিন্তু পরে সেগুলো মারা গেছে। এতে অবশ্য সৌন্দর্য্য হানি হয়েছে সমুদ্র সৈকতের। যদিও মরা গাছের গুঁড়ির সাথে থাকা লম্বা লম্বা শেকড় আটকে রাখছিল চরের মাটিকে। সময় স্বল্পতায় আমার নামা হয়নি বিচে। আমাদের ট্রলার যখন চর কুকরি মুকরির কাছাকাছি আসছিল তখন দেখা মিলল কালির চরের কাদাযুক্ত সাগর পাড়ে হাজার হাজার পাখির। এই পাখিগুলোর ৯৯ ভাগই সাদা রঙের। সাদা বকতো আছেই। সাথে সাদা পালক আর কালো ঠোটের ঘোঙ্গর পাখি, সি গার্লসহ নানান জাতের পাখি। এক দল ঝাঁক বেঁধে উড়ছে। আবার দল বেঁধে সারিবদ্ধভাবে বসছে। কোনোটি পানির ওপরে। কোনোটি পানি ও বালুর সংযোগস্থলে। হোসেন মাঝি বললেন, ‘এগুলো অতিথি পাখি।’ অতিথি পাখি কিছু ছিল। তবে অধিকাংশকে আমার কাছে উপকূলীয় সামুদ্রিক পাখিই মনে হয়েছে। এই পাখিগুলো শুধু একটি এলাকায় নয়। তিনটি এলাকায় ভাগ হয়ে বসে মাছ শিকার করছিল। কালির চরে এত পাখির উপস্থিতির কারণ, এখানে পর্যটকদের কোনো উৎপাত নেই। একেবারেই নিরিবিলি। তাই নিরাপদে বিচরণ করে বেড়াচ্ছিল পাখিগুলো।

বনে চিল, শালিক, দোয়েল, টুনটুনি, ঘুঘু, টিয়াসহ নানান জাতের দেশী পাখি। আর সাগর পাড়ে হাজার সামুদ্রিক পাখি। দারুণ মুগ্ধ করবে ভ্রমণপিপাসুদের। চর কুকরি মুকরি ও কালির চরকে বিভক্তকারী খালের দুই পাশের সবুজ সমতল ভূমিতে অনেক সাদা বক কানি বকসহ নানান জাতের পাখির দেখা মিলবে। শিয়ালও কিছুক্ষণ পরপর আসে খাবার সংগ্রহে। আর এই খাল দিনে কয়েকবার করে সাঁতরে পাড়ি দেয় গরু ও মহিষের পাল। তা খাবার সংগ্রহের জন্য। যতবারই আমি কুকুরি মুকরি গিয়েছি প্রতিবারই গরু-মহিষের এই খাল পাড় হওয়ার দৃশ্য দেখেছি। অবশ্য এরা ভাটার সময়ই পার হয়। জোয়ারের সময় নয়।

রাতুল, হোসেন মাঝি, মাঝি জাকির বক্সের দাবি, আবার যেন এই কালির চরকে পর্যটকবান্ধব করা হয়। তাহলে চর কুকরি মুকরির ওপর চাপ কমবে। সে সাথে কালির চর আবার পর্যটকদের একটি স্পট হবে।