স্বামী-স্ত্রীর আদর্শ জীবন

Printed Edition
islami logo
স্বামী-স্ত্রীর আদর্শ জীবন

মো: লোকমান হেকিম

আল্লাহ যার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা সঠিক সময়ে আল্লাহ দিয়ে দেবেন। শুধু অপেক্ষা করতে হবে, ভরসা করতে হবে, একজনের উপর তিনি কে? একমাত্র আল্লাহ। পবিত্র বিয়ে বন্ধনের মাধ্যমে দু’জন নারী-পুরুষের মধ্যে দাম্পত্যজীবন ও পারিবারিক জীবনের সূচনা হয়। ইসলামী শরিয়তে এই সম্পর্ক কায়েম করতে হলে যেমন সুনির্ধারিত কিছু বিধান রয়েছে, তেমনি এ সম্পর্ক বজায় রাখতে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন পালন করতে হয়। আবার প্রয়োজনে এ সম্পর্ক ছিন্ন করতে হলেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে চলতে হয়। বিয়ের মাধ্যমে যে দাম্পত্য সম্পর্কের সূচনা হয়, তা অটুট থাকা এবং আজীবন স্থায়িত্ব লাভ করা ইসলামে কাম্য। সুতরাং স্বামী-স্ত্রী কখনো বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চেষ্টা করবে না এবং বিয়ে-বিচ্ছেদের পরিস্থিতিও সৃষ্টি করবে না। কেননা, বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হলে, এর কুপ্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর উপর সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং গোটা পরিবারটিই তছনছ হয়ে যায়। সাধারণত বৈবাহিক সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার পেছনে মৌলিক যেসব কারণ থাকে সেগুলো হলো- স্বামী-স্ত্রী একে অপরের হক যথাযথ আদায় না করা, একজন অন্যজনকে গুরুত্ব না দেয়া, কথায়-কাজে অযথা গালাগালি করা এবং একে অন্যের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা। এসব কারণে একসময় তাদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ চরমে পৌঁছে এবং দাম্পত্যজীবন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। সুতরাং স্বামী-স্ত্রী উভয়ের কর্তব্য হলো- পরস্পরের হকগুলো যথাযথভাবে জানা এবং তা আদায় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। কোনো ক্ষেত্রে দোষ-ত্রুটি হয়ে গেলে তা অকপটে স্বীকার করে নেয়া এবং অতি দ্রুত সেটিকে শুধরে নেয়া। এখানে স্বামী-স্ত্রীর আবশ্যকীয় শরয়ি হকগুলো তুলে ধরা হলো। তাদের জন্য এগুলো যথাযথভাবে পালন করা জরুরি।

স্বামীর ওপর স্ত্রীর আবশ্যকীয় হক : স্ত্রীর সাথে সর্বদা সদাচরণ করা। * স্ত্রীর কোনো কথায় বা কাজে কষ্ট পেলে মাথা গরম না করে ধৈর্যধারণ করা। * স্ত্রী উচ্ছৃঙ্খলভাবে বা বেপর্দা চলাফেরা করতে থাকলে, হিকমতের সাথে নম্র ভাষায় তাকে বোঝানো। * সামান্য বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া-বিবাদ না করা। কথায় কথায় ধমক না দেয়া এবং রাগ না দেখানো। * স্ত্রীর আত্মমর্যাদায় আঘাত করে এমন কথা না বলা বা এমন কাজ না করা। * শুধু শুধু স্ত্রীর প্রতি কুধারণা না করা। স্ত্রীর ব্যাপারে উদাসীন না থাকা। * সামর্থ্যানুযায়ী স্ত্রীকে উত্তম খোরপোশ দেয়া। তবে অপচয় করা যাবে না। * যথাসাধ্য উত্তমভাবে স্ত্রীকে রাখার ব্যবস্থা করা এবং তার জন্য স্বতন্ত্র উত্তম আবাসনের বন্দোবস্ত করা। * স্ত্রীকে নামাজ পড়া এবং দ্বীনের হুকুম-আহকাম মেনে চলার জন্য উৎসাহ দিতে থাকা। হায়েজ-নেফাস ও অন্য প্রয়োজনীয় মাসয়ালাগুলো ভালোভাবে শিক্ষা দেয়া। শরিয়ত পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা। * একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে সমতা বজায় রাখা। * চাহিদানুযায়ী তাদের সাথে মেলামেশা ও প্রয়োজন পূর্ণ করা। অনুমতি ব্যতীত আজল না করা অর্থাৎ- মেলামেশার সময় শেষ মুহূর্তে প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার আগে ত্যাগ না করা। * একান্ত নিরূপায় না হলে তালাক দেয়ার কল্পনাও না করা অথবা তালাক দিয়ে দেবো- এ ধরনের কথা না বলা। মাঝে মধ্যে স্ত্রীকে তার নিকটাত্মীয়দের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার সুযোগ করে দেয়া। স্ত্রীর সাথে মেলামেশার কথা অন্যের কাছে বর্ণনা না করা। একান্ত প্রয়োজন হলে স্ত্রীকে শাসন করতে বা সতর্ক করতে পারবে। তবে শরিয়ত যতটুকু অনুমতি দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি করা যাবে না। তাকে কখনো অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা কিংবা নির্দয়ভাবে মারপিট করা যাবে না।

স্ত্রীর ওপর স্বামীর অপরিহার্য হক : সর্বদা স্বামীকে খুশি করতে এবং তার মন জয় করার চেষ্টা করা। * স্বামীর সাথে অসংযত আচরণ না করা। স্বামীকে কষ্ট না দেয়া। * শরিয়তসম্মত প্রত্যেক কাজে স্বামীর নির্দেশ মেনে চলা এবং তার আনুগত্য করা। গুনাহ ও শরিয়তবিরোধী কাজে অপারগতা তুলে ধরা এবং স্বামীকে নরম ভাষায় বোঝানো। * প্রয়োজনাতিরিক্ত বা স্বামীর সাধ্যের বাইরে ভরণ-পোষণ দাবি না করা। * পূর্ণরূপে পর্দা করা। পরপুরুষের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক না রাখা। * স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাউকে ঘরে ঢোকার অনুমতি না দেয়া। * স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া বা কোথাও না যাওয়া। * স্বামীর সম্পদের হিফাজত করা। অনুমতি ছাড়া সেখান থেকে কাউকে কোনো কিছু না দেয়া। * স্বামীকে অসন্তুষ্ট করে অতিরিক্ত নফল নামাজে মশগুল না থাকা। স্বামীর সম্মতি ব্যতীত নফল রোজা না রাখা। * স্বামী যেকোনো সময় মেলামেশার জন্য আহ্বান করলে শরিয়তসম্মত ওজর ব্যতীত কোনোরকম আপত্তি না করা। * স্বামীর আমানত হিসেবে নিজের ইজ্জত-আব্রুর হিফাজত করা। এতে কোনো ধরনের খেয়ানত না করা। * স্বামী দরিদ্র বা অসুন্দর হওয়ার কারণে তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করা। * স্বামীকে কোনো গুনাহের কাজ করতে দেখলে আদবের সাথে তাকে বুঝিয়ে বিরত রাখার চেষ্টা করা। * স্বামীর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। তার নাম ধরে না ডাকা। * কারো কাছে স্বামীর বদনাম বা দোষ-ত্রুটি বর্ণনা না করা। * শ্বশুর-শাশুড়িকে শ্রদ্ধা করা। যথাসাধ্য তাদের খিদমত করা। কটু কথা বলে বা ঝগড়া-বিবাদ করে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাদের মনে কষ্ট না দেয়া। * সন্তানদের হক আদায় করা। তাদেরকে উত্তমরূপে লালন-পালন করা। সুখী দাম্পত্য জীবন-দাম্পত্য জীবন এমনভাবে গড়ে তুলুন, যেখানে ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়া থাকবে। শুধু সন্তানের জন্য একসাথে থাকার বাধ্যবাধকতা নয়; বরং জীবনসঙ্গীর সাথেই শান্তি খুঁজে পাওয়ার এক অপরূপ সম্পর্ক। সন্তান যদি কখনো পৃথকও হয়ে যায়, স্বামী-স্ত্রী যেন পরস্পরের প্রতি সেই একই ভালোবাসা, নির্ভরতা ও আন্তরিকতা বজায় রাখতে পারেন। রাসূল সা: বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীদের প্রতি উত্তম আচরণ করে। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের প্রতি সবচেয়ে উত্তম আচরণকারী।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ-১৯৭৭)

লেখক : গবেষক-কলামিস্ট