রাজনৈতিক সহিংসতা চিত্রায়নে প্রথম আলোর পক্ষপাত
দ্য ডিসেন্ট মিডিয়া ওয়াচের পর্যবেক্ষণ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
স্বাধীন মিডিয়া উদ্যোগ দ্য ডিসেন্ট নিয়মিতভাবে ‘মিডিয়া ওয়াচ’ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, যাতে প্রধান ধারার গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা যাচাই করা হয়। তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি প্রথম আলোতে চারটি ভিন্ন রাজনৈতিক, ধর্মীয় দল ও সংগঠনের কর্মসূচিতে সংঘটিত সহিংসতা কিভাবে উপস্থাপন হয়েছে তা বিশ্লেষণ করেছে।
বিশ্লেষণের জন্য বাছাইকৃত ৪টি ঘটনা
১. ২০১৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর জামায়াতের কর্মসূচিতে সংঘটিত সহিংসতা।
২. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশের সময় এবং পরবর্তী দিনগুলোতে সহিংসতা।
৩. ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সংঘটিত সহিংসতা।
৪. ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় ঘোষণার আগে ও পরে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে সংঘটিত সহিংসতা।
প্রথম আলোর চিত্রায়নের ভিন্নতা
প্রথম আলো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে সহিংসতার সংবাদ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে।
আওয়ামী লীগ : কর্মসূচিতে সংঘটিত সহিংসতার দায় খুবই বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া সরাসরি দলের ওপর আরোপ করা হয়নি। সহিংসতার খবরগুলো অনেক সময় বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, এমনকি নিহত ভিকটিমদের ক্ষেত্রে। শিরোনামে নেতিবাচক শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘দুর্বৃত্ত’ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু নেই।
বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজত : এই দলের কর্মসূচিতে সংঘটিত সহিংসতার দায় প্রায় সবক্ষেত্রেই সরাসরি দলগুলোর ওপর আরোপ করা হয়েছে। শিরোনামে ব্যবহৃত শব্দ যেমন ‘জামায়াতের সহিংসতা’, ‘হেফাজতের তাণ্ডব’, ‘বিপুল সহিংসতা’, ‘হত্যার রাজনীতি’, ‘রোষানল’, ‘অগ্নিসংযোগ’ ইত্যাদি অত্যন্ত নেতিবাচক এবং আবেগপ্রবণ।
সংখ্যাগত বিশ্লেষণ
মোট ৩০০টি প্রতিবেদনের মধ্যে চারটি ঘটনায় ১৭৮টি প্রতিবেদনে সহিংসতা বর্ণনা করা হয়েছে।
জামায়াতের সহিংসতা (সাঈদীর রায়-পরবর্তী ৩ দিন) : ২৪টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২০টিতে প্রথম আলো নিজস্ব বয়ানে দায় আরোপ করা হয়েছে।
হেফাজতের সহিংসতা : ১৯টি প্রতিবেদনের মধ্যে ১৬টিতে দায় আরোপ করা হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত : ৩৯টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২৪টিতে সরাসরি দায় আরোপ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ : ৯৬টি প্রতিবেদনের মধ্যে মাত্র চারটিতে দায় আরোপ এবং শিরোনামে উল্লেখ মাত্র একটিতে। বাকি ৭৪টি প্রতিবেদনে দায়িত্ব সংক্রান্ত কোনো উল্লেখ নেই।
মানবিক প্রতিবেদন এবং পক্ষপাত
সাঈদীর রায়ের পর জামায়াত কর্মী ৩৩ জন নিহত হলেও, তাদের পরিবারের ওপর কোনো ফলোআপ মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। বিপরীতে, আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ১৪ জন নিহতের জন্য তিনটি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
হেফাজতের ঘটনায় ৫১ জন নিহত হয়েছেন; ৪৮ জন হেফাজতের কর্মী হলেও তাদের পরিবারের ওপর কোনো ফলোআপ মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। বরং, হেফাজতের ‘বর্বরতা’ তুলে ধরতে ১০টি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে প্রধানত গাছপালা, বাস, স্টেডিয়াম ইত্যাদির ক্ষতি ও ‘ভোগান্তি’কে মানবিক দৃষ্টিতে দেখানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে ১২ দিনে চারজন নিহত ও বহু আহত হয়েছেন। মোট ৯৬টি প্রতিবেদনের মধ্যে একটি মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দায় আওয়ামী লীগের ওপর আরোপ করা হয়নি।
প্রথম আলোর শিরোনাম, ভাষা ও মানবিক প্রতিবেদনের ব্যবহার প্রকাশ করে যে, বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের সহিংসতা নেতিবাচক ও আবেগপ্রবণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে সংঘটিত সহিংসতাকে ‘কম নেতিবাচক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ভিন্নতা প্রথম আলোর ঘোষিত নিরপেক্ষ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নীতি এবং ‘বস্তুনিষ্ঠ, দলনিরপেক্ষ’ দৈনিক হওয়ার প্রচারের সাথে সাংঘর্ষিক। মিডিয়ার এই পক্ষপাতিপূর্ণ চিত্রায়ন রাজনৈতিক সহিংসতার সংবাদ পরিবেশে পাঠকের কাছে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।