ক্যাম্পাসে ফিরছে লেজুড়বৃত্তি ও আধিপত্যের রাজনীতি, শঙ্কায় শিক্ষার্থীরা

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

আমরা দখলদারিত্ব আর আধিপত্যের পুরনো দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাই না।

ফারদিনা জেরিন

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের কল্যাণ হওয়ার কথা থাকলেও দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়াকে তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি, শোডাউন ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ক্যাম্পাসগুলো আবারো অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এতে প্রকৃত শিক্ষার্থীরা উপকৃত হওয়ার বদলে নতুন করে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

জাতীয় রাজনীতির সঙ্ঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষাঙ্গনে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৮ জন এবং আহত হয়েছেন সাত সহ¯্রাধিক। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের প্রতিবেদন বলছে, এই ধারা ২০২৬ সালেও অব্যাহত। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ৩৬ জনের মৃত্যু ও চার হাজার মানুষ আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে, এসব সহিংসতার ৯১.৭ শতাংশের সাথে বিএনপির নেতাকর্মীরা সম্পৃক্ত। এ ছাড়া নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের ২০.৭ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীর ৭.৭ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির ১.২ শতাংশ সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতার রেশ ক্যাম্পাসগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

জাতীয় পর্যায়ের এই অস্থিরতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্ম দিচ্ছে। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গত মঙ্গলবার গ্রাফিতির শব্দ পরিবর্তন ও ফেসবুক লাইভকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। এতে এক শিবিরকর্মীর পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অন্তত ২০ জন আহত হন।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) গত ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ছাত্রদলের সাথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। সরকারি তিতুমীর কলেজে ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর ব্যানার টাঙানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছরের ১৯ এপ্রিল অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাতের জেরে ছুরিকাঘাতে জাহিদুল ইসলাম পারভেজ নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মাহাথির আদালতে দায় স্বীকার করেছেন।

৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা যে নিরাপদ ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারদিনা জেরিন বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম দখলদারত্ব বন্ধ হবে, কিন্তু আবার পুরনো সেই আতঙ্ক ফিরে আসছে। শিক্ষার্থীরা আর লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি দেখতে চায় না।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্থি আনজুম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হলো গবেষণা ও পড়ার জায়গা, পেশিশক্তি দেখানোর মাঠ নয়। এই অস্থিতিশীলতা আমাদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে ফেলছে।’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিব মনে করেন, ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের কল্যাণের চেয়ে তাদের ‘মাদার পার্টির’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও প্রভাব বিস্তারকেই মুখ্য মনে করে। তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী বর্ষা জানান, ক্যাম্পাসের তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মাঝরাতে তৈরি হওয়া ভীতিকর পরিস্থিতি তাদের পরিবারের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আনিসুর রহমান এই পরিস্থিতিকে সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ‘অশনিসঙ্কেত’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট পরবর্তী প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা সমাধান নয়, বরং এর সংস্কার জরুরি।’

উত্তরণের পথ হিসেবে তিনি কিছু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। ডাকসু, জাকসু, চাকসুসহ সব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়া। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ সীমিত করা। ক্যাম্পাসে সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিশ্চিত করা। তিনি আরো বলেন, ‘ছাত্রসংগঠনগুলোর এখন আত্মসমালোচনার সময়। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং যুক্তি ও বিতর্কের মাধ্যমে প্রকৃত নেতৃত্ব গড়ে তোলাই হওয়া উচিত তাদের লক্ষ্য। শিক্ষাঙ্গনকে কোনো রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের মঞ্চ হতে দেয়া যাবে না।’