ফিরল হারানো সূচকের বড় অংশ

পুঁজিবাজারে স্বস্তি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

  • আগের দিন যেমন গড়ে সবগুলো খাত দরপতনের শিকার ছিল তেমনি গতকাল সবগুলো খাতই আগের দিনের হারানো দর ফিরে পায়

মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পাল্টে গেল পুঁজিবাজার আচরণ। ইরানে মার্কিন-ইসরাইল যৌথ হামলার প্রভাবে রোববার দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের বড় ধরনের পতন ঘটে; কিন্তু গতকাল ওই হারানো সূচকের একটি বড় অংশই ফিরে পেয়েছে বাজারগুলো। আগের দিনের আতঙ্ক কাটিয়ে শেয়ার কিনতে অনেকটা ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো অবস্থা ছিল গতকাল বিনিয়োগকারীদের। এর ফলে ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরু থেকেই ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকটি লেনদেনের মাঝামাঝি পর্যায়ে ১১৫ পয়েন্টের বেশি উন্নতি ঘটে। একই অবস্থা ছিল চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও। তবে শেষদিকে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের একটি অংশ হারিয়ে ফেলে বাজারগুলো।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৭২ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৪৬১ দশমিক ৭০ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার লেনদেনমেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৫৩৪ দশমিক ০৪ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৪৭ ও ১০ দশমিক ০৬ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সবগুলো সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি রেকর্ড করা হয় গতকাল। এখানে সিএসই সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৬৯ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৭০ দশমিক ৮৬ ও ৮৮ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট।

সোমবার সকালে লেনদেনের শুরুতেই বাজারে ব্যাপকভাবে ক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়। আগের দিন আতঙ্কে যেসব বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে লোকসান কমাতে তৎপর ছিলেন তারাই যেন সবার আগে বিক্রি করা শেয়ার কেনার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠলেন। কে কার আগে শেয়ার কিনতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলছিল লেনদেনের শুরুতেই। আর একই কারণে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলছিল বাজার সূচক। ঢাকা ৫ হাজার ৪৬১ দশমিক ৭০ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি দুপুর সাড়ে ১২টার পর পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৫৭৭ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে। অর্থাৎ এ পর্যায়ে সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ১১৫ পয়েন্টের বেশি। লেনদেনের এ পর্যায়ে প্রথমবারের মতো বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। দিনের বাকি সময় এ চাপ অব্যাহত থাকলে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের একটি অংশ হারিয়ে বসে বাজারটি। তবে লেনদেনের গতি ছিল যথেষ্ট ভালো। তাই দিনশেষে বাজারটির লেনদেন আগের দিনের চেয়ে কিছুটা বৃদ্ধি পায়। একই সময় সূচক ও লেনদেনের উন্নতি ঘটে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণে বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, এ মুহূর্তে আতঙ্ক কাটিয়ে স্বস্তিতে ফিরতে শুরু করেছে পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরাও ভালো মেজাজে আছেন। তবে তারা মনে করেন, আমাদের বিনিয়োগকারীরা কোনো সময়ই পরিপক্ব আচরণ করেন না। কোনো কারণ ছাড়াই আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের লোকসান নিজেরাই করেন। রোববার বিক্রিতে যেমন প্রতিযোগিতা ছিল তেমনি গতকাল শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে ছিল একই রকম প্রতিযোগিতা। অথচ একটা দিন ধৈর্য ধরলে এমন আহামরি কিছুই ঘটত না। কোন ঘটনা কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে তা নির্ধারিত হওয়ার আগেই আমরা আতঙ্কে নিজেদের পুঁজি নিজেরাই নষ্ট করে দিচ্ছি। এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক আচরণ হতে পারে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারকে টেকসই করতে হলে প্রথমে বিনিয়োগকারীদের যৌক্তিক আচরণ করতে হবে। নিজেদের পুঁজির সুরক্ষার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে।

দিনের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আগের দিন যেমন গড়ে সবগুলো খাত দরপতনের শিকার ছিল তেমনি গতকাল সবগুলো খাতই আগের দিনের হারানো দর ফিরে পায়। তরে এর মধ্যেও সূচকের ওঠানামায় বরাবরের মতোই ব্যাংকিং খাতের ভূমিকাই ছিল বেশি। পাশাপাশি ভূমিকা দেখা গেছে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও। দিনশেষে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকায় বেশির ভাগই ছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত। তা ছাড়া মূলধন সমৃদ্ধ হওয়ায় সূচকের উন্নতিতেও বড় ভূমিকা ছিল এ দুই খাতের কোম্পানিগুলোর। আবার দিনের শেষভাগে সূচকের হ্রাস পাওয়াতেও ছিল এ দুই খাতের ভূমিকা। গতকাল দুই বাজারেই সবগুলো খাতেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা গেছে। আবার বেশ কয়েকটি খাতেই দাম বেড়েছে শতভাগ কোম্পানির। ফলে দিনশেষে বাজারগুলোতে লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডগুলোর বেশির ভাগই উঠে আসে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়। ঢাকায় লেনদেন হওয়া ৩৯৪টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৪০টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হরিয়েছে ৪২টি। দর অপরিবর্তিত ছিল ১২টি কোম্পানি ও ফান্ডের। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৯৭টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দাম বেড়েছে ১৪০টির। দাম কমেছে ৪৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৩টি সিকিউরিটিজের দাম।

গতকালও ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষস্থানটি দখলে রাখে সিটি ব্যাংক। ৪৬ কোটি এক লাখ টাকায় এক কোটি ৩৯ লাখ ১০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির। ৪৪ কোটি ২০ লাখ টাকায় ১১ লাখ ৫৮ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ওরিয়ন ইনফিউশন ছিল দিনের দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ব্যাংক এশিয়া, রবি অজিয়াটা, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, গ্রামীণফোন ও ইনটেক অনলাইন।

মূল্যবৃদ্ধিতে গতকাল ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান লংকা বাংলা ফিন্যান্স। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। লেনদেন শুরুর পর কিছুক্ষণ শেয়ারের বেচাকেনা চললেও একপর্যায়ে কোম্পানিটির শেয়ারের কোনো বিক্রেতা ছিল না। ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এবি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, এনার্জি প্যাক পাওয়ার জেনারেশন, ইউনাইটেড ফিন্যান্স, এনআরবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।