আলজাজিরা ওপিনিয়ন

যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপাকে ফেলতে পারে

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের ওপর হামলার ব্যাপারে রক্ষণশীল ভিন্নমত রিপাবলিকান পার্টিকে দ্বিধাবিভক্ত করা ছাড়াও এ বছর মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের স্থায়িত্ব পরীক্ষায় ফেলেছে। এটা স্পষ্ট যে ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে মৌলিকভাবে নতুন রূপ দিতে চলেছে। মার্কিন রাজনীতিতে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপর এর তাৎক্ষণিক প্রভাব এবং ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের স্থায়িত্ব হ্রাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আমেরিকান ডানপন্থী কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নিন্দা করেছেন। এই নিন্দা মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন ক্যাম্পেনে ইতোমধ্যে উত্তেজনা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপর ইসরাইলের প্রভাব সম্পর্কে রক্ষণশীল উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে, এটি আন্তঃদলীয় বিভাজনের জন্য ভালো সময় নয়। ইরানের সাথে যুদ্ধ এবং ইসরাইলের প্রতি বৃহত্তর সমর্থন নিয়ে রক্ষণশীল ঝগড়া নভেম্বরে রিপাবলিকানদের ক্ষতি করতে পারে।

রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকি বেশি : মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং ১০০টি সিনেটের মধ্যে ৩৫টি আসন ব্যালটে থাকবে এবং বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের কারণে ট্রাম্পের এজেন্ডা এগিয়ে যাবে কি না, ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠরা তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে হোয়াইট হাউজকে কতটা জোরালোভাবে এগিয়ে নিতে পারে এবং ওয়াশিংটনে ইসরাইলের অবস্থান কতটা নিরাপদ থাকবে তা নির্ধারণ করবে।

‘ইসরাইলের যুদ্ধ’ এবং ভিন্নমত

শনিবারের প্রাথমিক হামলার আগের দিনগুলোতে, প্রভাবশালী ডানপন্থী সাংবাদিক টাকার কার্লসন তার লাখ লাখ সোশ্যাল মিডিয়া অনুসারীদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিশ্চিত করার জন্য ইসরাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্ঘাতে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ কেবল ইসরাইল চেয়েছিল বলেই ঘটেছে’। প্রাক্তন কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিন এক্স-এ পোস্ট করেছেন যে, ‘এই হামলা (ইরানি) শিশুদের হত্যা’ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডার পরিপন্থী।

রক্ষণশীল ভাষ্যকার ক্যান্ডেস ওয়েন্স এক ডজনেরও বেশি পোস্ট করেছেন যেখানে যুক্তি দিয়েছেন যে, ইসরাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে প্ররোচিত করেছে। এই তিনজনের লাখ লাখ সোশ্যাল মিডিয়া অনুসারী এবং মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন আন্দোলনের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের সমালোচনা রিপাবলিকান নীতি কর্মসূচির ওপর বিস্তৃত বিভক্তির ইঙ্গিত দেয়। একই আন্দোলনের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের মধ্যে, মেগিন কেলি, ম্যাট ওয়ালশ এবং হজ টুইনস, যুদ্ধকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে নিন্দা করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া ভুলে যায় না

সাম্প্রতিক রক্ষণশীল সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার মূল নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। ডানপন্থী ভাষ্যকাররা ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যক্তিত্বদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড-সহ অন্যান্যকে পুরনো বিবৃতি এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলো পুনরায় তুলে ধরেন।

উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প বলেছিলেন যে, তার নেতৃত্বে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘বিদেশী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর জন্য দৌড় বন্ধ করবে’। এ ছাড়াও ২০১২ এবং ২০১৩ সালের অসংখ্য টুইটে ট্রাম্প পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে হয় অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিতে, তার পুনর্নির্বাচনের প্রচেষ্টা জোরদার করতে অথবা জরিপের সংখ্যা কমে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ দিতে ইরানে আক্রমণ করবেন।

২০২৩ সালে ভ্যান্স ইরাকে মার্কিন আক্রমণকে ‘বিপর্যয়’ বলে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, মার্কিন ‘বিদেশ নীতি এখনো পুরুষদের দ্বারা জিম্মি... (যারা) পরবর্তী যুদ্ধকে সমর্থন করবে এবং তারপরে পরবর্তী যুদ্ধকে, যতক্ষণ না (দেশটি) ফাঁকা হয়ে যায়।’ ২০২৪ সালে, ভ্যান্স ইরানের সাথে যুদ্ধের ধারণার নিন্দা করেছিলেন।

২০১৬ এবং ২০২০ উভয় ক্ষেত্রেই, গ্যাবার্ড ‘যুদ্ধবাজদের’ বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। ২০২০ সালের এক সাক্ষাৎকারে, গ্যাবার্ড বলেছিলেন যে, ‘ইরানের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ ইরাক এবং আফগানিস্তানে আমরা যে যুদ্ধগুলো দেখেছি তা পিকনিকের মতো করে তুলবে।’ সমালোচকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, ইরানের সাথে যুদ্ধ কেবল ভুল নয়; বরং এটি মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন জোট যে আদর্শিক প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল তার লঙ্ঘন।

একটি ভাঙা দল

ইরান যুদ্ধের আগেও, রিপাবলিকানরা সাম্প্রতিক স্মৃতির যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো বেশি বিভক্ত ছিল। দুই বছরের বেশি সময় ধরে, কার্লসন, ওয়েন্স, গ্রিন এবং আরো অনেকে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি রিপাবলিকান নীতির সমালোচনা করেছেন। ইসরাইলের পক্ষে ইরানের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, বিভাজনকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। রক্ষণশীল ভাষ্যকার ক্যান্ডেস ওয়েন্স এক ডজনেরও বেশি পোস্ট করেছেন, যেখানে যুক্তি দিয়েছেন যে, ইসরাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে প্ররোচিত করেছে। প্রভাবশালী শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী নিক ফুয়েন্তেস-সহ কিছু রক্ষণশীল এতটাই ক্ষুব্ধ যে, তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরিবর্তে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

যদি এই আহ্বান জনপ্রিয়তা পায়, তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে যে, রিপাবলিকানদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। রয়টার্স জরিপ বলছে, মাত্র এক-চতুর্থাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। মাত্র ৫৫ শতাংশ রিপাবলিকান যুদ্ধ সমর্থন করেন।

এ সবকিছুই তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবে ট্রাম্প এবং তার দলের ওপর গণভোট হিসেবে কাজ করেছে। হাউজের সব সদস্য প্রতি দুই বছর অন্তর ভোটারদের মুখোমুখি হন এবং প্রেসিডেন্টের দল প্রায় সবসময় মধ্যবর্তী চক্রে আসন হারায়, বিশেষ করে যখন একজন প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের রেটিং ৫০ শতাংশের নিচে থাকে। ট্রাম্প, যার অনুমোদনের হার ৩৬ শতাংশ থেকে ৩৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, সম্প্রতি তিনি প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, যার প্রথম মেয়াদে এবং দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ৫০ শতাংশেরও কম অনুমোদনের রেটিং ছিল।

রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন

কয়েক দশক ধরে, আমেরিকানরা ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইসরাইলিদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল। গড়ে ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে, গ্যালাপ জরিপে ইসরাইলিরা ৪৩ শতাংশ এগিয়ে ছিল। তবে গত সপ্তাহে, একটি গ্যালাপ জরিপে বলা হয়েছে- ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমেরিকান সহানুভূতি ইসরাইলিদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি। ২০২৪ সাল থেকে, রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরাইলিদের প্রতি সমর্থন ১০ শতাংশ কমেছে।

যদি ইরান নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভেদ কংগ্রেসের ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে এর পরিণতি কেবল ট্রাম্পের এজেন্ডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভোটারদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার ফলে কংগ্রেস পুনর্গঠিত হলে ইসরাইল-পন্থী নীতির প্রতি প্রতিক্রিয়াশীলতা কমতে পারে।

গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা ইতোমধ্যে ইসরাইলের প্রতি মার্কিন জনমতকে বদলে দিয়েছে এবং মার্কিন সমর্থনের ভিত্তিকে এমনভাবে চাপে ফেলেছে যা একসময় কল্পনাও করা যেত না। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ উটের কোমর ভেঙে দিতে পারে- কেবল ট্রাম্পের দলের জন্যই নয়; বরং রাজনৈতিক ঐকমত্যের জন্যও, যা দীর্ঘ দিন ধরে ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থন নিশ্চিত করে আসছে।