চুয়াডাঙ্গায় বিএনপির সাথে সংঘর্ষে জামায়াত নেতার ভাই নিহত

ইউনিয়ন আমির আইসিইউতে

Printed Edition
back-1
চুয়াডাঙ্গায় বিএনপির হামলায় আহত হাফেজ মাওলানা মফিজুর রহমানকে দেখতে হাসপাতালে যান ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ বাজারে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষে একজন নিহত ও অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। নিহত হাফিজুর রহমান (৫৫) জামায়াতের এক ইউনিয়ন আমিরের বড় ভাই বলে জানা গেছে। এ ছাড়া জামায়াতের ইউনিয়ন আমির ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ উভয় পক্ষের ছয়জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শনিবার হাসাদাহ বাজারের কামিল মাদরাসা গেটের সামনে ইফতারের পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দুই দফায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহত হাফিজুর রহমান একজন স্বনামধন্য জুয়েলারি ব্যবসায়ী ও জীবননগর শহরের ‘ঢাকা জুয়েলার্স’-এর মালিক। শনিবার দিনগত রাত আড়াইটার দিকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন জীবননগর উপজেলার বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও নিহতের ছোট ভাই মফিজুর রহমান। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালের আইসিইউতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জামায়াতের আরো আহতরা হলেন- সুটিয়া গ্রামের খায়রুল ইসলাম (৫০) ও সোহাগ (৩৫)। তাদের মধ্যে দু’জন জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের আমির ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অন্য দিকে, সংঘর্ষে বিএনপির তিনজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন- জীবননগর উপজেলার বাঁকা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম মাস্টার (৫০), হাসাদাহ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত নেতা মেহেদী হাসান (৪০) এবং তার পিতা জসীম উদ্দিন (৬৫)।

কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পূর্বশত্রুতার জেরে শনিবার ইফতারের পর হাসাদাহ বাজারে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে বাগি¦তণ্ডা শুরু হয়। এ সময় হাসাদাহ ইউনিয়ন জামায়াতের ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ইসরাফিল এবং পার্শ্ববর্তী বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের যুব বিভাগের নেতা সুটিয়া গ্রামের সোহাগের সাথে সদ্য বহিষ্কৃত হাসাদাহ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান ও তার পিতা জসীম উদ্দিনের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উভয়পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মেহেদী হাসান ও তার পিতাকে মারধর করে ইসরাফিল ও সোহাগ। পরে মেহেদীর স্বজনরা ঘটনাস্থলে এসে তাদের ধাওয়া দিলে ইসরাফিল ও সোহাগ সেখান থেকে সরে যান। প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট পর জামায়াতের হাসাদাহ ও পার্শ্ববর্তী বাঁকা ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা বাজারে জড়ো হলে আবারো সংঘর্ষ বাধে।

এ সময় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মফিজুর রহমানের ওপর হামলা চালালে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান তার বড় ভাই হাফিজুর রহমান। তখন হামলাকারীরা হাফিজুর রহমানকেও মারধর করে এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।

সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের উদ্ধার করে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাফিজুর রহমান ও মফিজুর রহমানকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠান। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে তাদের এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাফিজুর রহমান মারা যান। মফিজুর রহমানের শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হলে তাকে ঢাকার আরেকটি হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের এমপি ও জেলা জামায়াতের আমির মো: রুহুল আমিন বলেন, ‘বিএনপির লোকজন আমাদের নিরীহ নেতা-কর্মীদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’

জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোলাইমান হোসেন বলেন, হাসাদাহে দুই পক্ষের সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর বিষয়টি জানা গেছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জীবননগরে জামায়াতের বিক্ষোভ, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, বিএনপিকর্মীদের সাথে সংঘর্ষে জামায়াত নেতার মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল করেছে জামায়াতে ইসলামী জীবননগর শাখার নেতাকর্মীরা। গতকাল বেলা ১১টার দিকে উপজেলা জামায়াতের কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়।

মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইসলামী ব্যাংকসংলগ্ন সড়ক হয়ে জীবননগর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা সাজেদুর রহমান, নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেন, পৌর যুব জামায়াতের সভাপতি আরিফ জোয়ার্দার।

বক্তারা অভিযোগ করেন, পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে তাদের এক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। তারা ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।

আহত মাওলানা মফিজুর রহমানের শয্যা পাশে আমিরে জামায়াত

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান এমপি গতকাল সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চুয়াডাঙ্গা জীবননগরে বিএনপির হামলায় গুরুতর আহত হাফেজ মাওলানা মফিজুর রহমানকে দেখতে যান। এ সময় তিনি হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছে মফিজুর রহমানের শারীরিক খোঁজ-খবর নিয়ে উন্নত চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন দিকনির্দেশনা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের প্রদান করেন।

পরে আমিরে জামায়াত মুফিজুর রহমানের সুস্থতা কামনায় বিশেষ দোয়া মুনাজাত করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি, পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য ও পল্টন থানা আমির শাহীন আহমেদ খান প্রমুখ।