ডিজিটাল এনবিআরে অ্যানালগ মানসিকতা

এক কিকে কর তবু বাড়ছে অভিযোগ

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

কর প্রশাসনকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব করার ল্য নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দ্রুতগতিতে ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল, ই-টিআইএন, ভ্যাট অটোমেশন, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীা ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘স্মার্ট ট্যাক্সেশন’ বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও কর্মকর্তাদের মানসিকতায় কাক্সিত পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ করদাতা ও ব্যবসায়ীদের। এমন পরিস্থিতিতে কর অফিসের দীর্ঘদিনের জটিলতা ও হয়রানির অনেক উপাদান এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও নতুন রূপে ফিরে আসছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এনবিআরের ডিজিটালাইজেশন কি সত্যিই করদাতার জন্য স্বস্তি বয়ে আনছে, নাকি পুরনো অ্যানালগ মানসিকতাকেই প্রযুক্তির আবরণে আরো শক্তিশালী করছে।

এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা এক কোটির বেশি। আয়কর রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে, যার একটি বড় অংশ অনলাইনে রিটার্ন জমা দিচ্ছেন। গত কয়েক বছরে অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটালাইজেশনের ফলে করদাতাদের কর অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন কমেছে এবং সেবা গ্রহণ সহজ হয়েছে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সঙ্গঠন, কর পরামর্শক ও করদাতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনলাইন সিস্টেমে তথ্য আপডেট, রিটার্ন জমা দেয়া বা কর পরিশোধের সময় প্রায়ই নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। অনেক েেত্র জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, জমির তথ্য বা পূর্ববর্তী কর নথির সাথে সিস্টেমের তথ্যের অমিল দেখা যায়। ফলে করদাতাদের অনলাইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও সরাসরি কর অফিসে গিয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়।

রাজধানীর মিরপুরের ব্যবসায়ী আব্দুস শহীদ নয়া দিগন্তকে বলেন, অনলাইনে রিটার্ন জমা দিয়েছি, কিন্তু পরে জানানো হলো কিছু তথ্য যাচাই করতে অফিসে যেতে হবে। আবার কাগজপত্র জমা দিতে হয়েছে। এতে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুবিধা কোথায়।

কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি হলো তথ্যভাণ্ডারের সমন্বয়হীনতা। উন্নত দেশগুলোতে কর প্রশাসন ব্যাংক, ভূমি রেজিস্ট্রেশন, কোম্পানি নিবন্ধন, শেয়ারবাজার ও অন্যান্য সরকারি ডাটাবেজের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে। বাংলাদেশেও সেই ল্য নির্ধারণ করা হলেও এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডার পরস্পরের সাথে পুরোপুরি সংযুক্ত নয়। ফলে স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ ব্যবস্থায় ভুল তথ্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে, যা দণি এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও রাজস্ব আহরণে কাক্সিত অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক অদতা এবং কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ডিজিটালাইজেশন এ সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে, তবে তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের মানের ওপর।

সম্প্রতি এনবিআর ঝুঁকিভিত্তিক কর নিরীা বা রিস্ক-বেইজড অডিট ব্যবস্থা চালুর দিকে এগোচ্ছে। এই ব্যবস্থায় অ্যালগরিদমের মাধ্যমে করদাতাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে মানবীয় হস্তপে কমবে এবং প্রকৃত কর ফাঁকিদাতাদের শনাক্ত করা সহজ হবে। তথ্যভাণ্ডার যদি নির্ভুল না হয়, তাহলে অ্যালগরিদমও ভুল ফলাফল দিতে পারে।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কর বিশেষজ্ঞ মো: মনিরুজ্জামান বলেন, রিস্ক-বেইজড অডিট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। কিন্তু এর জন্য উচ্চমানের তথ্য প্রয়োজন। যদি ডেটা ভুল হয়, তাহলে নির্দোষ করদাতাও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন। তিনি বলেন, কোনো করদাতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাকে ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ এবং দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এ দিকে ডিজিটাল কর ব্যবস্থার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সংস্কৃতি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক কর কর্মকর্তা এখনো ডিজিটাল নথির ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। ফলে অনলাইনে তথ্য জমা দেয়ার পরও করদাতাদের কাছ থেকে কাগজপত্র চাওয়া হয়। কখনো একই তথ্য একাধিকবার জমা দিতে বলা হয়।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই ডিজিটাল সংস্কৃতি তৈরি হয় না। কর্মকর্তাদের মানসিক পরিবর্তনও প্রয়োজন। যদি কর্মকর্তা অনলাইন তথ্যের পরিবর্তে কাগজপত্রকেই বেশি গুরুত্ব দেন, তাহলে ডিজিটালাইজেশনের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। তিনি বলেন, অনেক েেত্র স্বয়ংক্রিয় নোটিশ জারির পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ ছাড়া সমস্যার সমাধান হয় না। এতে অনলাইন ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের সাথে তথ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে করদাতাদের আয়, সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক তথ্য অনলাইনে সংরতি হচ্ছে। এসব তথ্য ফাঁস হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তারা বলছেন, ডিজিটাল কর ব্যবস্থার সফলতার জন্য শুধু সফটওয়্যার তৈরি করলেই হবে না। আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীা এবং দ জনবল নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যবসায়ী সঙ্গঠনগুলোর নেতারা বলছেন, তারা ডিজিটাল কর ব্যবস্থার বিরোধী নন। বরং তারা মনে করেন, প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়লে কর প্রশাসন আরো স্বচ্ছ হবে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, কর প্রশাসনে প্রযুক্তির ব্যবহার সময়ের দাবি। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কারও জরুরি। তিনি বলেন, ডিজিটাল সিস্টেম দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যদি বিধি-বিধান ও প্রশাসনিক আচরণ অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে কাক্সিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, করদাতাকে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে নয়, ‘সেবাগ্রহীতা’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার আগামী কয়েক বছরে কর প্রশাসনকে আরো আধুনিক করার পরিকল্পনা নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ, সমন্বিত করদাতা ডাটাবেজ এবং স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগও রয়েছে।

তবে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রশাসনিক জবাবদিহি, তথ্যের নির্ভুলতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কর্মকর্তাদের দতা নিশ্চিত না করা গেলে ডিজিটালাইজেশনের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।

তারা বলছেন, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু এই রূপান্তর তখনই সফল হবে, যখন প্রযুক্তি করদাতার জন্য হয়রানির নতুন পথ না হয়ে সেবা গ্রহণের সহজ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।