জুলাই সনদ নিয়ে অস্বস্তিতে সরকারি দল!
সংবিধানপরিপন্থী ও আপত্তি জানানো ইস্যুর বাস্তবায়ন চাইবে না বিএনপি
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই সনদ নিয়ে একরকম অস্বস্তিতে রয়েছে সরকারি দল বিএনপি। বিশেষ করে গত ৩ মার্চ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের চিঠি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে হাইকোর্টের রুল জারির পর বিষয়টি নিয়ে কেউই কোনো মন্তব্য করছেন না। যদিও নির্বাচনের আগে ও পরে, এমনকি সরকার গঠনের পরও সরকারি দলের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। তবে একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সংবিধান পরিপন্থী ও আপত্তি জানানো ইস্যুগুলোর বাস্তবায়ন চায় না বিএনপি।
সূত্র মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের চিঠি নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রুল জারির তারিখ থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে এর জবাব দিতে বলা হয়েছে। গত ৩ মার্চ বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো: আনোয়ারুল ইসলামের বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। এর আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক দু’টি রিট করা হয়। রিটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বাতিল চাওয়া হয়। এ ছাড়া সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ অবৈধ ঘোষণার নির্দেশনা চাওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী রেদোয়ান-ই খোদা রনি ও অ্যাডভোকেট গাজী মো: মাহবুব আলম রিট দু’টি দায়ের করেন। এ দিকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জুলাই সনদ বাতিল ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণার নির্দেশনা চেয়ে আরেকটি রিট দায়ের করা হয়। রিটে জুলাই সনদের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের রিটে বিবাদি করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি ও তার জোটভুক্ত সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধানে বিধান না থাকায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। এতে রাজনৈতিক আবহাওয়া কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছিল, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ১১ দলীয় জোট এই অবস্থায় বিএনপিকে চাপে রাখতে কোনো শপথ নেবে না বলে ঘোষণা দেয়, কিন্তু পরণেই তারা কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই সংসদ সদস্য ও পরিষদের সদস্য হিসেবে দু’টি শপথ গ্রহণ করে।
জানা গেছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি নীতিগত সমর্থন দিলেও এর প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নে তাদের অনীহা রয়েছে। দলটি দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা উচ্চক গঠনের মতো বেশ কিছু বিষয়ে নির্দিষ্ট সংস্কারের বিরোধিতা করছে। যদিও বিএনপি নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছে যে, ভোটাররা যদি গণভোটে এটি অনুমোদন করে তবে তারা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মতায় আসায় বিএনপির পে নীতি বাস্তবায়ন সহজ হলেও তা জবাবদিহিতা কমিয়ে দিতে পারে এবং প্রতিশোধমূলক রাজনীতির দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই জাতীয় সনদের সব কিছু বাস্তবায়নের বাস্তবতা নেই। সনদে বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী অনেক বিষয় সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সংস্কার কমিশনের সংলাপে অনেক ইস্যুতে আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি, নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। চূড়ান্ত করা জুলাই জাতীয় সনদে সব ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তুলে দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও সংস্কার কমিশনের সিদ্ধান্তে বিএনপি ও অন্য অনেক দলের আপত্তি তুলে দেয়া হয়েছে। বিএনপি নেতারা বলেন, সংস্কার প্রস্তাবের সব ইস্যুই বাস্তবায়ন করতে হবে তা মনে করে না বিএনপি। সংস্কার কমিশন যেসব প্রস্তাব রেখেছে সেসবের মধ্যে যেগুলোতে রাজনৈতিক দলের মতামত রয়েছে সেগুলোতে বিএনপি বিশেষ নজর দেবে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সংসদই নেবে।
জানা গেছে, আলোচিত তিনটি বিষয় নিয়ে যেহেতু আদালত রুল জারি করেছে, তাই এটা নিয়ে বিএনপির নেতারা ব্যক্তিগতভাবে কোনো মতামত দেবে না। যেহেতু আগামী ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন শুরু হবে, সেখানেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। তারা মনে করে যেসব বিষয়ে বিএনপি আপত্তি জানিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেসব নোট অব ডিসেন্ট বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি বলতে গেলে চাপিয়ে দিয়েছে। তাই জটিলতার মুখে পড়েছে সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি। সংবিধান পরিপন্থী ও বেআইনি ইস্যুগুলো বাস্তবায়ন করে বিএনপি দায় কাঁধে নিতে চায় না। বিএনপি পুরো বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
এ দিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, নবনির্বাচিত সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি। জনগণ তাদের মতা দিয়েছে। এখন বিএনপি কোন পথে যায় সেটা দেখতে হবে। বিএনপির একাধিক সূত্র দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি সরাসরি দায় নেবে না। সংসদই ঠিক করবে সনদের কোন বিষয়টি গ্রহণ করা হবে, আর কোনটি হবে না। এ ছাড়া আদালতের বিষয়টিও সামনে রাখা হচ্ছে। যাতে করে কোনো বিষয় আদালতের রুলের বিরুদ্ধেও না যায়। আবার নির্বাচনের আগে জনগণকে দেয়া তাদের ওয়াদার বিষয়টিও সামনে রাখছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সম্প্রতি গণমাধ্যমে বলেন, নির্বাচনের আগের আর নির্বাচনের পরের ব্যাপারগুলো এক নয়। তিনি বলেন, সংসদই সবকিছুর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে আলোচনা করেই যেকোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি। বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না এটা আমি নিশ্চিত করতে পারি।
উল্লেখ্য, সংসদ নির্বাচনের যে ২৯৭ আসনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। একই সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পে ৬৮.০৬ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। ত্রয়োদশ সংসদের সাথে অনুষ্ঠিত চতুর্থ গণভোটে অংশ নিয়েছেন ৭ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ৫৬ জন। অর্থাৎ ভোটের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটে রায় দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন (৬৮.০৬ শতাংশ)।
জুলাই জাতীয় সনদের তিনটি ভাগ আছে। প্রথম ভাগে আছে সনদের পটভূমি, দ্বিতীয় ভাগে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব এবং তৃতীয় ভাগে আছে সনদ বাস্তবায়নের ৭ দফা অঙ্গীকারনামা। জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সম্পর্কিত, বাকিগুলো অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে, সংসদে উপস্থাপনের প্রয়োজন হবে না। অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বিএনপির ওপর, যদিও ঐকমত্য কমিশনের সব দল প্রস্তাব বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২৭০ দিনের মধ্যে ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব সংবিধান সংস্কার পরিষদে পাস না হলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
তবে নাম প্রকাশ না করে বিএনপি নেতারা বলেন, সংস্কার প্রস্তাবের সব ইস্যুই বাস্তবায়ন করতে হবে তা মনে করে না বিএনপি। সংস্কার কমিশন যেসব প্রস্তাব রেখেছে সেসবের মধ্যে যেগুলোতে রাজনৈতিক দলের মতামত রয়েছে সেগুলোতে বিএনপি বিশেষ নজর দেবে।