কিইস আইন বদলে দিলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ক্ষমতা কাঠামো
জরুরি আইন থেকে লুটপাটের স্থায়ী ব্যবস্থা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে আজ যে অতিরিক্ত ব্যয়, অলাভজনক চুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন নীতিগত ভুলের ফল নয়। বরং এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যকর থাকা একটি বিশেষ আইনি কাঠামোর ভেতর। ২০১০ সালে প্রণীত ‘কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই (স্পেশাল প্রভিশনস) আইন’- সংক্ষেপে কিইস (ছঊঊঊঝ) আইন- যা জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলার জন্য তৈরি হয়েছিল, ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ খাত পরিচালনার স্থায়ী শাসনব্যবস্থায় রূপ নেয়। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির (এনআরসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিভাবে এই ‘জরুরি আইন’ প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে লুটপাটতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির (এনআরসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ‘ব্যয়বহুল চুক্তির ফাঁদে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন : প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং ভাড়া আদায়ের কৌশল’- এ দেখানো হয়েছে, কিভাবে একটি ‘জরুরি আইন’ প্রতিযোগিতা, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির জায়গা দখল করে নিয়ে দরকষাকষি ও বিবেচনাধীকারভিত্তিক সিদ্ধান্তকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। জরুরি অজুহাত, স্থায়ী ব্যতিক্রম
২০১০ সালে তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। লোডশেডিং, শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাত ও জনঅসন্তোষের মুখে সরকার দ্রুত সমাধানের চাপে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে কিইস আইন প্রণীত হয়, যার লক্ষ্য ছিল প্রচলিত ক্রয়বিধি ও দরপত্র প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো।
স্বল্পমেয়াদে এর সুফল মিললেও সমস্যা শুরু হয় আইনটির ধারাবাহিক মেয়াদ বাড়ানোর মাধ্যমে। এক বছরের জন্য প্রণীত এই আইন শেষ পর্যন্ত ১৪ বছরেরও বেশি সময় কার্যকর থাকে। ব্যতিক্রম হিসেবে যা তৈরি হয়েছিল, সেটিই নিয়মে পরিণত হয়।
প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের অবসান
কিইস আইনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়ায়। খোলা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে চালু হয় সরাসরি আলোচনা ও আনসলিসিটেড প্রস্তাব। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু প্রকল্পে দরদাতার সংখ্যা ছিল সীমিত, একই স্পন্সর বারবার চুক্তি পেয়েছে এবং ট্যারিফ অস্বাভাবিকভাবে কাছাকাছি দামে নির্ধারিত হয়েছে। এতে মূল্য আবিষ্কারের প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে এবং এক ধরনের ‘র্যাচেটিং এফেক্ট’ তৈরি হয়- দাম কমার সুযোগ না থেকে শুধু বাড়ার ধারা বজায় থাকে।
ক্ষমতার সঙ্কীর্ণ বলয়
এই শাসনব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইচউই-এর একটি সীমিত বলয়ে। আনুষ্ঠানিক টেকনিক্যাল কমিটি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর ভূমিকা ছিল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আদানি পাওয়ার বা রিলায়েন্স-জেরা প্রকল্পের মতো বড় চুক্তিতে যথাযথ ডিউ ডিলিজেন্স এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।
বিপিডিপি : ক্রেতা থেকে ‘পাস-থ্রু’ সংস্থা
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিপি) একসময় সর্বনিম্ন দামে বিদ্যুৎ কেনার দায়িত্বে থাকলেও এখন তা কার্যত চুক্তি বাস্তবায়নকারী এক ‘পাস-থ্রু’ সংস্থায় পরিণত হয়েছে। টেক-অর-পে চুক্তি, সার্বভৌম গ্যারান্টি ও ডলার ইনডেক্সেশনের কারণে চাহিদা থাকুক বা না থাকুক, নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। রিলায়েন্স-জেরা প্রকল্পে পুরনো টারবাইন নতুন দামে দেখিয়ে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নিয়ন্ত্রকের কোণঠাসা ভূমিকা
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দায়িত্ব ছিল ট্যারিফ নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু কিইস আইনের আওতায় অধিকাংশ ট্যারিফ সরাসরি চুক্তিতে নির্ধারিত হওয়ায় নিয়ন্ত্রকের কার্যকর ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে।
পরিকল্পনা ও দায়মুক্তির সঙ্কট
বিদ্যুৎ মাস্টার প্ল্যানগুলো পরিকল্পনার নির্দেশক না হয়ে পরে অনুমোদিত প্রকল্পকে বৈধতা দেয়ার নথিতে পরিণত হয়। অতিরঞ্জিত চাহিদা পূর্বাভাসের ফলে তৈরি হয় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা। এর সাথে যুক্ত হয় আইনি দায়মুক্তি ও বিদেশী সালিসি ধারা, যা দেশীয় জবাবদিহিকে আরো দুর্বল করে।
কাঠামোগত সমস্যার মূলে
আজকের উচ্চমূল্য, বাজেটের চাপ ও কাঠামোগত সঙ্কট কোনো বিচ্যুতি নয়, বরং কিইস আইনের অধীনে গড়ে ওঠা শাসনব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিণতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর সংস্কারের জন্য উপসর্গ নয়- এই আইন-উত্তর শাসন কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে আনতে হবে।