বিলাতি ইঁদুর: শফিকুল আলম টিটন
Printed Edition
হেমন্তের হিমেল বাতাস শীতের আগমনের বার্তা দেয়। এই ঋতুতে গন্ধরাজ, শিউলি, মল্লিকা, কামিনী, দেব কাঞ্চন, রাজ অশোক, ছাতিম ও বকফুলের মতো বিভিন্ন ফুল ফোটে। ফুল প্রিয় রিমু রতœা চায় উৎসুক গ্রামের ফুল বাগানে ঘুরে বেড়াতে।
গাছ থেকে পেড়ে খায় কামরাঙা, চালতা, নারিকেলসহ নানাবিধ ফল। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এমন সময় গ্রামের বাড়িতে থাকে পিঠা পুলির মহাউৎসব। তাই কাঁথা কম্বল মুড়ি দিয়ে দাদুর মুখে গল্প শুনে খলখলিয়ে হেসে ওঠে ওরা বারবার।
হি হি হি হি, হা হাহা হা, হো হো হো
রিমু আর রতœা হাসছে। সাথে তুহিনও। সেই কাক ডাকা ভোর থেকে হেসেই চলেছে।
কিরে রতœা আজ তোর কী হয়েছে ? হাসছিস কেন?
পাগলামিতে ধরেছে ? এত হাসলে দাঁত কানা রোগ হবে। দাঁত খুলে খুলে সব পড়ে যাবে। বলতে না বলতেই আরেক চোট হেসে উঠল ওরা।
মায়ের কথায় টিপ্পনি কেটে বলে, ইসস, অত সহজে দাঁত খুলে পড়বে না। আর যদি পড়েই যায়, তাহলে
তাহলে ?
তাহলে কি আবার! দাদুর মতো সোনার দাঁত বাঁধিয়ে নেবো।
বললেই হলো?
ইশ! শখ কত ! সোনার দাঁত বাঁধিয়ে নেবো? বললেই হলো। বলি টাকা কি গাছে ধরে? সোনার দাম কত জানিস? - আপু বলতে বলতে বিছানার ওপর উঠে বসে।
পেয়েছি! পেয়েছি!! ইউরেকা!!! রিমু চিৎকার দিয়ে ওঠে।
কি পেয়েছিস রে রিমু। রতœা জানতে চায়।
যদি দাঁত পড়েই যায়, তাহলে
তাহলে কী রিমু?
তাহলে ভাঙা দাঁত ইদুরের গর্তে ফেলে দিয়ে নতুন দাঁত চাইব!!
এমন কথা শুনে তুহিন ঢোক গেলে।
হে ইঁদুরের গর্তে! দেবার সময় বলতে হবে,
‘ইঁদুর ভায়া কোথায় আছো
ভাঙা দাঁতটি নাও,
গর্তে দিলাম ফেলে তোমার
নতুন দাঁতটি দাও।’
ব্যস। কিল্লাফতে। মুখে আবার নতুন দাঁত গজাতে শুরু করবে।
তুহিন এক গাল হেসে বলে, কচু কচু ! তুমি গুল মারছ।
ইঁদুর কি দাঁতের ব্যবসা করে নাকি যে, চাইলেই বড় দাঁত দেবে। ইদুর ভায়া তো মানুষ দেখলে দৌড়ে পালায়।- হাসতে হাসতে রতœা বলে।
আল্লা তুমি কি বোকা! মহাবোকা! কিচ্ছু বোঝো না। সে তো অন্য ইদুর?
বলোকি? আকাশ থেকে পড়ল আপু। তাহলে কি সেটা চিকা! ছুঁচো!!
না তাও না। সেটা হলো বিলাতি ইঁদুর!
বি লা তি ইঁদুর! ওহ নো!! অবাক না হয়ে পারে না সবাই।
ইতোমধ্যে মা বিষয়টা বুঝে নিয়েছে। তাই চুপচাপ ঘুমোনোর চেষ্টা করছে। মাঝে মধ্যে এক চোখ খুলে দেখে আর মুখ টিপে টিপে হাসে। তৃপ্তির হাসি। সে হাসি আনন্দের! খুশি আর মহাসুখের!!
রিমু তার কথা অনর্গল বলে যাচ্ছে।
ফরেনার ইঁদুর! সাদা ধবধবে, কী সুন্দর। বিদেশীদের মতো।
তাইতো ওর নাম বিলাতি ইঁদুর ! সেই ইঁদুর না! সেই ইঁদুর না! বলতে বলতে বার দুয়েক ঢোক গিলে রিমু।
আরে ওটা কী? ওটা কী? সরাৎ করে চলে গেল দেখলাম! আপু বলে।
কই দেখি দেখি! দেখার জন্যে ঝুঁকে পড়ে সবাই। বিলাতি ইঁদুর মনে হয় চলে গেল!
হুম। আমি তো এতক্ষণ এই ইঁদুরের কথাই বলছিলাম। রতœার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রিমু বলে।
সেটাই বিলাতি ইঁদুর। ধর ধর সবাই। যেমন বলা তেমন কাজ! সবাই ইঁদুর ধরার কাজে লেগে গেল। ইঁদুরটাকে ধরতেই হবে!
রতœা যেই ইঁদুরটাকে ধরতে গেল অমনি ধপাস।
উফফ ! মা-গো ! বড্ড ব্যথা লাগল।
হি হি হি- রতœা আপু বোয়াল মাছ ধরেছে। রিমু বলে।
রতœা এবার ক্ষেপেই গেলো। হাসবি না তোরা! তোর বিলাতি ইঁদুর ধরতে গিয়েই তো পড়েছি ! উঠতে গিয়ে প্রায় ককিয়ে ওঠে, মা রে বাবা রে! এই রিমুটার জন্য আমি পড়েছি ।
কী আমার জন্যে? ফোস করে ওঠে রিমু।
তোমার জন্যই তো আমি পড়েছি।
তুই তুহিন ভাইয়ার জন্য পড়েছিস।
নারে তোর জন্য।
মা শুয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে কান খাড়া করে মুখ টিপে টিপে হাসছে।
লেগে গেল গৃহযুদ্ধ। একজন মিজাইল, একজন বোমা, একজন ককটেল তো আরেকজন। মা এবার ভীষণ রেগে গেলেন।
তোরা কি থামবি? নাকি চোতরা পাতা নিয়ে এসে আচ্ছামতো দেবো দুজনকে।
তোদের ঝগড়াতে বিলাতি ইঁদুর পগার পার। নে খোঁজ কর।
সবাই খুঁজতে শুরু করল। বিছানার তলায়, বুক শেলফের ভেতর, মিটসেভ এর নিচে। এমন কোনো জায়গা বাদ রইল না খুঁজতে।
রিমু আবার রতœাকে দোষারোপ করে।- তোর জন্যে পালিয়েছে বিলাতি ইঁদুর।
না তোর জন্যে ! না তোর জন্যে !
মা বিকল্প পথ খুঁজে না পেয়ে বলল, থাম থাম। অনেক হয়েছে। ইঁদুর কারো জন্যে পালায়নি। তোদের কারো কোনো দোষ নেই।
যত দোষ নন্দ ঘোষ!
এবার সমস্বরে সবাই হো হোহ হো করে হেসে উঠল।
আমি তোদের একটা বিলাতি ইঁদুর দেবো। তোরা সবাই মিলে ঝিলে খেলা করবি।
আচ্ছা । সায় দেয় সবাই।
মা এবার বিলাতি ইঁদুরটা রিমুর হাতে দেয়।
বিলাতি ইঁদুর পেয়ে রিমু মহা খুশি। ওর দিকে তাকিয়ে রিমু বলে, আজ থেকে ওর নাম টুসি! বাঁধা দেয় রতœা। না না ওর নাম টুসি ভূষি চলবে না!
ওর নাম হলো টুকু! হুম। এই নাম খুব ভালো চলবে।
মা আনমনে হাসতে হাসতে বলে, পাগল কোথাকার?
মা চলে যায় হেঁসেল ঘরে। রতœা পড়ার ঘরে। তুহিন আর রিমু খেলতে বসে যায় ইঁদুরটাকে নিয়ে। বিলাতি ইঁদুর ততক্ষণে পালানোর চেষ্টা করছে। একবার ওদের মুখে পিটপিট করে চায়। একবার বাইরে বেরুনোর দরজার দিকে। সুযোগ আসতেই প্রাণভয়ে দরোজা বরাবর বিলাতি ইঁদুর ভোঁ দৌড় ! তাই দেখে পেছন পেছন ছুটতে থাকে রিমু আর তুহিন!!