সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের জানাজা অনুষ্ঠিত, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান
নিজ নিজ গ্রামে দাফন
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
সুদানে শাহাদতবরণকারী ছয় শান্তিরক্ষীর নামাজে জানাজা গতকাল রোববার ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুদানের আবেই এলাকায় গত ১৩ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে সংঘটিত বর্বরোচিত সন্ত্রাসী ড্রোন হামলায় এ ছয় শান্তিরক্ষী শাহাদতবরণ করেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, নামাজে জানাজায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তা, অন্যান্য পদবির সদস্যগণ এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন।
নামাজে জানাজার আগে শাহাদতবরণকারীদের জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করে শোনানো হয় এবং তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মুনাজাত করা হয়। মুনাজাত শেষে তাদের কাছে আত্মীয়রা বক্তব্য রাখেন। এরপর জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের পক্ষে ইউনিসফার চিফ কমিউনিটি লিয়াজোঁ অফিসার বরিস-এফ্রেম চৌমাভি বক্তব্য দেন। তিনি বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনী ও নিহতদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি নিহতদের ‘শান্তির সৈনিক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তারা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েও পেশাদারত্ব, সততা ও সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
নামাজে জানাজা শেষে তাদের প্রতি যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হয়। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে তার সামরিক সচিব পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শাহাদতবরণকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ইউনিসফার চিফ কমিউনিটি লিয়াজোঁ অফিসার শহীদ শান্তিরক্ষীদের আত্মীয়দের কাছে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে জাতিসঙ্ঘের পতাকা হস্তান্তর করেন। নামাজে জানাজা শেষে শাহাদতবরণকারীদের পরিবারের কাছে প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষরিত পৃথক পৃথক শোকবার্তা হস্তান্তর করা হয়।
এই ঘৃণ্য ড্রোন হামলার ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসঙ্ঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইতঃপূর্বে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র প্রেরণ করা হয়েছে এবং ইউনিসফাসহ সব মিশন এলাকায় যথাশিগগিরই ড্রোন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ ডিসেম্বরের ড্রোন হামলায় ছয়জন শান্তিরক্ষী শহীদ হওয়ার পাশাপাশি ৯ জন শান্তিরক্ষী আহত হন, যাদের মধ্যে আটজন কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অবস্থিত আগা খান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে (লেভেল-৩ হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বর্তমানে সবাই শঙ্কামুক্ত রয়েছেন।
এ দিকে জানাজা ও সম্মাননা প্রদান শেষে হেলিকপ্টারে করে নিহতদের লাশ নাটোর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রাজবাড়ী ও কিশোরগঞ্জে নিজ নিজ বাড়িতে পাঠানো হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে। এর আগে গত শনিবার এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে তাদের লাশ দেশে আনা হয়। দেশে আনার আগে আবিয়েতে তাদের নামাজে জানাজা ও সামরিক সম্মান জানানো হয়।
নিজ নিজ গ্রামে নিহত শান্তিরক্ষী সেনাদের দাফন
এদিকে নিহত বাংলাদেশী সেনাসদস্যদের লাশ গতকাল রোববার নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। লাশ পৌঁছালে প্রত্যেক এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গী গ্রামে রোববার বিকেলে দাফন করা হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো: শামীম রেজার লাশ। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে লাশ কালুখালী উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর পর গ্রামের বাড়িতে নেয়া হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। শামীম রেজা ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতার পাঠানো খবর অনুসারে, একই দিনে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার তারাকান্দি গ্রামে জানাজা শেষে দাফন করা হয় সেনাসদস্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে। বিকেল সোয়া ৪টার দিকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে লাশ পাকুন্দিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে পৌঁছায়। জানাজা ও দাফন শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার উলিপুর ও রাজারহাট উপজেলায় দাফন করা হয় সুদানে নিহত আরো দুই সেনাসদস্য মো: মমিনুল ইসলাম ও শান্ত মণ্ডলকে। রোববার দুপুরে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে লাশ উলিপুর হেলিপ্যাডে নামানো হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে গিয়ে সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়। নিহত শান্ত মণ্ডলের স্ত্রী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ ডিসেম্বর সুদানে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি স্থাপনায় সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় মোট ছয়জন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী নিহত হন। নিহতদের লাশ গত শনিবার বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছায়। দেশব্যাপী এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।